জুবাইর আল মুজাহিদ
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু জনপদ নিজেদেরকে সাহস, ত্যাগ আর প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে আলাদা করে চেনায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা ফেনী তেমনই একটি জনপদ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম ও সর্বশেষ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফেনীর মানুষ রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যেন এই জনপদের মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন ফেনীতেও ধীরে ধীরে জমতে থাকে আন্দোলন, যা এ জনপদের ক্ষোভ, সাহস আর প্রতিরোধের নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।
জুলাই আন্দোলনটা শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, দমন-পীড়ন, ভয়ভীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। ফেনীর আন্দোলনের বাস্তবতা ছিল আরও ভিন্ন। এখানে আন্দোলনের পেছনে শুধু একটি দাবির প্রশ্ন ছিল না; ছিল দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা নিজাম হাজারী সহ গরফাদারদের প্রতি অসন্তোষের বিস্ফোরণ। বহু বছর ধরে এ জনপদে ভিন্নমত প্রকাশ করা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক-অনেকেই বিভিন্ন সময়ে হয়রানি, ভয়ভীতি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফেনীর রাজপথে নেমে আসা তরুণদের বড় একটি অংশ এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিল, যেখানে প্রতিবাদ করাটাই ছিল সাহসের বিষয়।
ফেনীতে আন্দোলনের সূচনা হয় ৬ জুলাই। ট্রাংক রোডের শহীদ মিনারের সামনে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেন। সংখ্যায় ছোট হলেও সেই কর্মসূচির গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি কেননা এই আন্দোলনের মাধ্যমে ফেনীতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বীজবপন হয়। পুলিশের নজরদারি ও নানা বাধার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’ এবং ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগানে মুখর করে তোলেন চারপাশ। সেদিন হয়তো কেউ ভাবেনি, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণজাগরণে পরিণত হবে।
এরপরে ১৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে গণপদযাত্রা করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন। একই সময় আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ১৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের নিহত হওয়ার খবর ফেনীতেও গভীর প্রভাব ফেলে। সেদিন রেললাইন অবরোধ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।এদিনের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি ও চাপ বাড়তে শুরু করে।
১৭ জুলাই ছিল ফেনীর আন্দোলনের প্রথম সহিংসতা ঘটে। এদিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। নারী শিক্ষার্থীদের শারীরিক নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানি করেন। সেদিনের ঘটনাগুলো ঘটে পুলিশের উপস্থিতিতেই। অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। সেদিনের পর আন্দোলনের চিত্র বদলে যায়। এর পরবর্তীতে ফেনীতে এটি আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবি ছিল না; এটি হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
পরদিন ১৮ জুলাই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর অংশ হিসেবে শতাধিক শিক্ষার্থী রাজপথে নামেন। ফেনী কেন্দ্রীয় বড় মসজিদ এলাকায় অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথমে লাঠিচার্জ, পরে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। অনেক শিক্ষার্থী আহত হন, অনেকে আশ্রয় নেন আশপাশের মার্কেট ও গলিতে। ফেনীর বহু মানুষের স্মৃতিতে দিনটি রয়ে গেছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগের এক ভয়াবহ দিন হিসেবে।
এরপর আসে কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং অনিশ্চয়তার দিনগুলো। ১৯ ও ২০ জুলাই শহরের পরিবেশ বদলে যায়। সেনা টহল, অভিযান, গ্রেপ্তারের খবর আর আত্মগোপনে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের গল্প ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। প্রকাশ্যে বড় কর্মসূচি কমে গেলেও ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে যোগাযোগ ও সমন্বয়।
এদিকে ২৬ জুলাই বাদ জুমা শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা পড়েছে ফেনীর সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
ফেনীতে ২৮ জুলাই দেয়াল হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। ইসলামপুর রোড, তাকিয়া রোড ও পশ্চিম উকিলপাড়ার বিভিন্ন দেয়ালে লেখা হয় প্রতিবাদী স্লোগান। ‘রাষ্ট্র সংস্কার চাই’, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি’-এসব লেখা শহরের নীরব দেয়ালকে পরিণত করে প্রতিবাদের ক্যানভাসে।
২৯ জুলাই লাল কাপড় চোখে-মুখে বেঁধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানান ফেনীর শিক্ষার্থীরা।
৩০ ও ৩১ জুলাই ফেনীতে বড় কর্মসূচি না থাকলেও অনলাইনে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
১ আগস্ট ‘রিমেম্বার আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালনের সময় শিক্ষার্থীরা ফেনী প্রেসক্লাব এলাকায় বাধার মুখে পড়েন। তারা প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিতে না পেরে পাশের একটি গলিতে সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি পালন করেন। প্রবল বৃষ্টিতে পরে কর্মসূচি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পরদিন দৃশ্যপট বদলে যায়।
২ আগস্ট জুমার নামাজের পর ফেনীর রাজপথে নামে জনস্রোত। শুধু শিক্ষার্থীরা নন, সাধারণ মানুষও যুক্ত হন আন্দোলনের সঙ্গে। জিরোপয়েন্টের খেজুর চত্বরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করেন হাজারো ছাত্র-জনতা। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহর। সেদিনের জনসমাগম অনেকের কাছেই ছিল একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। মানুষ বুঝতে শুরু করে, আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
৩ আগস্টও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। আসরের নামাজের পর ট্রাংক রোডে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। শহরের প্রধান সড়কগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। উত্তেজনা বাড়ছিল, কিন্তু কেউ হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ একটি দিন।
৪ আগস্ট ২৪। ফেনীর ইতিহাসে দিনটি এক রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হন। এদিন আওয়ামীলীগের লোকজন প্রকাশ্যে আন্দোলমকারীদেরকে সশস্ত্র হামলার হুমকি দিলেও ছাত্রজনতা সেদিন ব্যাপকভাবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। মহিপাল প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে সেদিন ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিভিল চেক পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুপুরে জোহরের নামাজের কিছুসময় পরে নামাজরত জনতার উপরে সেখানে সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীরা হামলায় অংশ নেয়। সেই ঘটনায় এগারোজন আন্দোলনকারী নিহত হন, আহত হন শত শত মানুষ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইসতিয়াক আহমদ শ্রাবণ, সরোয়ার জাহান মাসুদ, সাইদুল ইসলাম শাহী, মাহবুবুল আলম মাসুম, ওয়াকিল আহমদ শিহাব, মো. সবুজ, মো. সাকিব, আবুবকর শিবলু, আব্দুল গনি বোরহান,সাইদুল ইসলাম আরিফ। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় আন্দোলনে নিহত ফেনীর আরও কয়েকজনের নাম শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয়। ফেনীর মানুষ আজও ৪ আগস্টকে স্মরণ করেন শোক, বেদনা এবং ক্ষোভের দিন হিসেবে।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলো আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে স্থানীয় গণমাধ্যমে কাজ করতাম। ফলে ঘটনাগুলোকে শুধু একজন আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী হিসেবে নয়, একজন সংবাদকর্মী ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবেও দেখেছি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ফেনীর খবর সংগ্রহ করত। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক প্রায় প্রতিদিন প্রেসক্লাবে বসে থাকতাম নতুন কোনো খবরের অপেক্ষায়।
ছাত্রদের ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে আমিও আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। কারফিউ, গ্রেপ্তার আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেনী তখন যেন অন্য এক শহর। অনেক শিক্ষার্থী আত্মগোপনে চলে যায়। পরিবারগুলো সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়। সেই সময়ে সাংবাদিকদের দায়িত্বও বেড়ে যায়। কারণ আমরা জানতাম, একটি ক্যামেরা, কিংবা একটি প্রেসকার্ড কখনো কখনো সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
আহত শিক্ষার্থীদের অবস্থান, গ্রেপ্তারের খবর কিংবা কোথায় অভিযান চলছে, এসব তথ্য পেতে এবং যাচাই করতে আমাদেরকে সাংবাদিক সহকর্মীরা সবসময় সহায়তা করেছেন। আমরা একে অন্যের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করেছি, কখনো আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছি, কখনো সংবাদ সংগ্রহের আড়ালে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি।
রাজপথে বহুবার দেখেছি, সাংবাদিকদের উপস্থিতি আক্রমণকারীদের অনেককে সংযত হতে বাধ্য করেছে। আবার এটাও দেখেছি, সাংবাদিকরাও নিরাপদ ছিলেন না। সহকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে, ক্যামেরা ভাঙা হয়েছে, সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেউ রাজপথ ছাড়েননি। ছাত্রদের উপর হামলায় তারাও ব্যাথিত হয়েছিল। কেঁদেছিল নিরবে সহযোগিতা করেছিল।
আজ সময়ের ব্যবধানে ফিরে তাকালে মনে হয়, জুলাই ছিল সাহস, ত্যাগ, রক্ত এবং সত্যকে ধারণ করার এক অনন্য অধ্যায়। যারা সেদিন রাজপথে ছিলেন, যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা ভয়কে অগ্রাহ্য করে প্রতিবাদ করেছেন এবং যারা সেই সময়ের ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছে, তাঁরা সবাই বাংলাদেশের তথা ফেনীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |