| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক জমজম কূপের আদ্যোপান্ত

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 04-10-2026 ইং
  • 21 বার পঠিত
বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক জমজম কূপের আদ্যোপান্ত
ছবির ক্যাপশন: বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক জমজম কূপের আদ্যোপান্ত


ওমর ফারুক 


জমজম কিঃ

জমজম একটি কূপ বা পানির ফোয়ারা। পৃথিবীর অপরাপর সকল কূপের মতো এটি সাধারণ কোন কূপ নয়। সৃষ্টি ইতিহাস, পানির গুন-মান, পানির পরিমাণ, পানি ভরণ পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জমজম কূপের রয়েছে কিছু বিশেষত্ব, যা অলৌকিক নিদর্শনও বটে। বিশেষত্ব বিবেচনায় জমজম কূপ একটি Beyond amazing। জমজম কূপের সাথে জড়িয়ে আছে একাধিক নবী, নবীপত্নী ও পরিবারের স্মৃতি গাঁথা। তাছাড়া আধূনিক মক্কানগরী ও সভ্যতার গোড়া পত্তন হয় এই জমজম কূপকে কেন্দ্র করেই। প্রায় ৫০০০ বছর সময়কাল থেকে মক্কা নগরী ও সভ্যতার ইতিহাসের সাথে জমজম কূপের নাম আষ্টেপৃষ্টে জড়িত। আধুনিক মক্কা নগরী ও সভ্যতার গোড়া পত্তনে জমজম কূপের রয়েছে অনস্বীকার্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।


জমজম শব্দের অর্থঃ

জমজম একটি হিব্রু শব্দ। জমজম শব্দের বাংলা অর্থ হলো অঢেল পানি, পানির শব্দ, অবরুদ্ধ হওয়া, থেমে যাওয়া, গর্জন, প্রাচুর্য, সঞ্চিত, শক্ত করে বাঁধা, অধিক ইত্যাদি। 


জমজম নামের প্রচলণঃ

অপরাপর কোন এলাকা, প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা বা বস্তুর ন্যায় কোন রীতি-নীতি বা প্রচলিত পদ্ধতিতে জমজম কূপের নামকরণ করা হয়নি। মূলত তৎসময়ে পানি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়া ও উপচে পড়ার (পানি আধিক্যের) কারণে বিবি হাজেরা "জমজম" (থামো বা অধিক হয়েছে) বলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এবং সেখান থেকেই জমজম নামের প্রচলন ও সে অনুযায়ী কূপটি "জমজম" কূপ হিসেবেই পরিচিতি পায়। 


জমজম কূপের সৃষ্টি ইতিহাসঃ

তখন ছিল হযরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত কাল। আল্লাহর হুকুমে নবী ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার স্ত্রী বিবি হাজেরা ও শিশু সন্তান ইসমাঈলকে জনমানব, পানি ও তরু-লতাহীন রুক্ষসুক্ষ মক্কার ধূ-ধূ মরুপ্রান্তরে রেখে আসার পর তাদের সাথে থাকা থলের স্বল্প পরিমাণ খেজুর ও মসকের অপ্রতুল পানি ফুরিয়ে গেলে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত বিবি হাজেরা খাবার, পানি বা সাহায্যকারী হিসেবে কোন মানুষের সন্ধান পাওয়ার আশায় সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ির ৭ম বার ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে ফিরে এসে দেখেন আল্লাহর কুদরতে ক্রন্দনরত শিশু ইসমাঈলের পায়ের গোড়ালির আঘাতে মরুবক্ষ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছে, যাতে জমজম কূপের সৃষ্টি হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে— বিবি হাজেরা ও শিশু ইসমাঈলের সাহায্যের প্রয়োজনে আল্লাহ জিবরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেন। জিবরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবতরণীয় পদাঘাতে বা (ডানা ঝাপটানোয়) ডানাঘাতে জমজম কূপের সৃষ্টি হয়। ইসলামের ইতিহাসে দু'টি মত-ই সমভাবে প্রণিধানযোগ্য।


জমজম কূপ সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্যঃ

ইসলামী ইতিহাসবেত্তাগণ মনে করেন— জনমানবহীন ধূ-ধূ বালুকারাশির মরুময় মক্কায় মানব বসতি ও সভ্যতা গড়ে তোলা, নবী ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উনার পুত্র ইসমাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহর ঘর পবিত্র কা'বা-র পুনঃনির্মাণ ও তাওয়াফ করানো এবং কালক্রমে  মক্কা নগরীকে বিশ্বের সকল মুসলমানদের জন্য একটি নিরাপদ মিলন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার মহান উদ্দেশ্যেই বিবি হাজেরা ও শিশু ইসমাঈলের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণের উছিলায় আল্লাহ জমজম কূপ সৃষ্টি করেছেন।


জমজম ঝর্ণা থেকে কূপঃ

আল্লাহর কুদরতে শিশু ইসমাঈলের পায়ের গোড়ালির আঘাতে অথবা জিবরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঘাত বা ডানাঘাতে যখন মরুবক্ষ থেকে পানি বেরিয়ে এসে চতূর্দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল তখন বিবি হাজেরা সেই পানির আধিক্য দেখে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আবেগ তাড়িত ও আহ্লাদিত কন্ঠে "জমজম" (অধিক হয়েছে বা থামো) বলতে বলতে গড়িয়ে যাওয়া পানির চতূর্দিকে বালু বা কোন কোন বর্ণনা মতে পাথর দিয়ে হাউজের মতো করে বাঁধ দিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে হাতের কোশ ভরে পানি পান করছিলেন, অতপর মসকে পানি ভরছিলেন। কথিত আছে বিবি হাজেরা যদি এই বাঁধ না দিতেন তবে এটি একটি প্রবাহমান ঝর্ণা বা নালা হতো, চতূর্দিকে গোলাকার বাঁধ দেওয়ায় প্রবাহিত পানি বাঁধের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে এটি কূপে রূপান্তরিত হয়।


জমজম কূপ-ই আধুনিক মক্কা নগরীর ভিত্তিঃ

একদা ইয়েমেন থেকে আগত "জুরহুম" গোত্রের কোন এক বাণিজ্য কাফেলা বা কিছুলোক বাণিজ্যিক প্রয়োজন বা ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে জমজম কূপ নিকটবর্তী পথ ধরে কোথাও যাচ্ছিলেন বা জমজম কূপের দিকে আসছিলেন। ইত্যবসরে কিছু পাখির চক্রাকারে উড্ডয়নরত ঘুর্ণন ক্রিয়া তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের ধারণা হলো এই পাখিগুলো নিশ্চয়ই পানির ওপর উড়ছে, কেননা এ পথ ধরে তারা এর আগেও বহুবার যাতায়াত করেছে কিন্তু এখানে তারা কখনো পানি বা এভাবে চক্রাকারে পাখিদল উড়তে দেখেনি। তাই তারা অনুসন্ধিৎসু হয়ে তাদের কাফেলা থেকে দু'জনকে পাঠালো ব্যাপারটি পরখ করতে। তারা সেখানে গিয়ে পানি দেখতে পেল এবং কাফেলায় ফিরে গিয়ে তাদেরকে পানির সুসংবাদ দিল। পানির সুসংবাদ শুনে উৎসুক মননে সবাই জমজম কূপের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো, সেখানে বিবি হাজেরা আগে থেকেই বসা ছিলেন। তারা কূপের কাছে এসে বিবি হাজেরাকে দেখে তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন— আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই, আপনি কি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন? বিবি হাজেরা বললেন— হ্যাঁ! বসবাস করতে পারো এবং এই পানি পান ও ব্যবহার করতে পারবে তবে এই পানির ওপর তোমাদের কোন অধিকার (মালিকানা) থাকবেনা। তারা তা স্বানন্দ্যচিত্তে স্বীকার করে নিল। অতঃপর আগন্তুক দলটি সেখানে বসতি স্থাপন করলো এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে সংবাদ পাঠালে তাদের পরিবার-পরিজনরাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগলো। এভাবে ইয়েমেন থেকে আগত জুরহুম গোত্রের   কিছু বণিক জমজম কূপ কেন্দ্রিক সর্বপ্রথম কয়েকটি বসতি স্থাপন করে।


বিভিন্ন বাণিজ্য কাফেলা ও আগন্তুকদের মাধ্যমে জমজম কূপের পানির খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পরবর্তীতে জমজম কূপ থেকে সহজে, অবিরত ও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্ত থেকেও কিছু পরিবার এসে বিবি হাজেরার প্রতিবেশী হিসেবে জমজম কূপের আশেপাশে বসতি স্থাপন করে। ইতিমধ্যে বসতি স্থাপন করা আত্মীয়-স্বজনদের মুখে জমজম কূপের পানির সুসংবাদ শুনে ক্রমান্বয়ে আরো কিছু পরিবার এসে জমজম কূপের আশেপাশে বসতি স্থাপন করে। 


অনেক বাণিজ্য কাফেলা আসা-যাওয়ার পথে বিশ্রাম ও পানি পানের আশায় জমজম কূপের আশেপাশে যাত্রা বিরতি করতো এবং এসব কাফেলার কেউ কেউ পরবর্তীতে বাণিজ্য পথের দূরত্ব কমানো ও নিজেদের প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে জমজম কূপের আশেপাশে বসতি স্থাপন করে। কোন কোন বাণিজ্য কাফেলার কোন কোন সদস্যের পরামর্শে তাদের কোন কোন আত্মীয় বা প্রতিবেশিরাও জমজমের পানি দ্বারা উপকৃত হওয়ার আশায় জমজম কূপের আশেপাশে এসে বসতি স্থাপন করে। এভাবেই সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো পরিবার মিলে একটি পাড়া-মহল্লা গড়ে উঠে। 


ক্রমান্বয়ে পাড়া-মহল্লা থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে নগর-সভ্যতা গড়ে উঠে। কালক্রমে মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সাফল্যমন্ডিত হয়ে সহজ, সুন্দর, নিরাপদ ও উচ্চাভিলাষী জীবন উপভোগ করতে নগর-সভ্যতাকে আধুনিক রূপ দান করে। আর এভাবেই জমজম কূপকে কেন্দ্র করে বর্তমান আধুনিক মক্কা নগরীর ভিত্তি গড়ে ওঠে। 


কালক্রমে  বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে হজ্ব মৌসুমে আল্লাহর ঘর কা'বা-র তাওয়াফে লক্ষ্য লক্ষ্য মুসলমানদের সমবেত হওয়ার মাধ্যমে মক্কা নগরী হয়ে উঠেছে একটি বিশ্ব মুসলিম মিলন কেন্দ্র। হজ্ব মৌসুম ছাড়াও আল্লাহর ঘর কা'বা ওমরাহ মুসল্লীদের তাওয়াফে দিন-রাত অবিরত মুখরিত থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজ্ব ও ওমরাহ করতে আসা লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ জমজম কূপের পানি পান করে ও পরিবার-পরিজনের জন্য নিয়ে যায়। শুভ কাজে সফলতা ও জটিল-কঠিন রোগ নিরাময়ের আশায়ও অনেকেই নিয়ত করে জমজম কূপের পানি পান করে থাকে। বলা যায়- এভাবে জমজম কূপ বিশ্বময় বিস্তৃত। 


বলে রাখা প্রাসঙ্গিক হবে যে, পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে বিবি হাজেরা আমৃত্যু জমজম কূপের পাশেই বসবাস করেছিলেন। বিবি  হাজেরার মৃত্যুর পরও যুবক ইসমাঈল (পরবর্তীতে নবী) বৈবাহিক জীবনে পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস করতেন।


জমজম কূপ মাটি চাঁপা পড়ার ইতিহাসঃ 

তখন মক্কার শাসন ক্ষমতা ছিল ইয়েমেন থেকে বণিক হিসেবে আগত জুরহুম গোত্রের হাতে। আরব ঐতিহাসিকদের মতে পৌত্তলিক যুগে জুরহুম গোত্রের শাসন ক্ষমতা যখন দূর্বল হয়ে পড়ে এবং খুজাআ গোত্র মক্কার শাসন ক্ষমতা দখল করতে উদ্যত হয়, তখন জুরহুম গোত্র মক্কা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জুরহুম গোত্র মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে জমজম কূপের সঠিক অবস্থান ও অস্তিত্ব গোপন করার উদ্দেশ্যে মাটি বা বালু দিয়ে তা সম্পূর্ণ ভরাট করে বা চাঁপা দিয়ে যায়, যাতে খুজাআ গোত্রের শাসকদের কেউ জমজম কূপের সন্ধান না পায় এবং কূপ থেকে উপকৃত হতে না পারে। প্রায় সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ বছর কূপটি এভাবে মাটি চাঁপা পড়ে ছিল। দীর্ঘ সময় কূপটি মাটি চাঁপা পড়ে থাকায় কূপের অবস্থান মানুষের অজানা হয়ে পড়ে এবং কূপটি বিস্মৃত হয়ে যায়।


জমজম কূপ পুনর্খননঃ

জমজম কূপ মাটি চাঁপা পড়ার প্রায় সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ বছর পর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের আগে কোন এক রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আব্দুল  মুত্তালিব স্বপ্নে দেখেন যে তাকে জমজম কূপের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে দেখিয়ে জমজম কূপ পুনর্খনন করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। স্বপ্ননুযায়ী তিনি তার একমাত্র পুত্র হারেসকে সাথে নিয়ে কা'বা ঘরের কাছে স্বপ্নাদিষ্ট স্থানে খনন কাজ শুরু করেন। অনেক চেষ্টার পর তিনি জমজম কূপ পুনর্খনন করেন। কূপ খননের সময় তিনি সেখানে কিছু তলোয়ার, লৌহবর্ম ও দু'টি সোনার হরিণ পেয়েছিলেন। আব্দুল মুত্তালিব তলোয়ার দিয়ে কা'বা ঘরের দরজা ঢালাই করে সোনার হরিণ দু'টি কা'বা ঘরের দরজায় সন্নিবেশিত করে দেন। 


জমজম কূপের আধিকারিকঃ

জমজম কূপ পুনরুদ্ধারের জন্য খনন কাজ করতে করতে আব্দুল মুত্তালিব যখন বুঝতে পারলেন তিনি কূপের সন্ধান পেয়েছেন, তখন তিনি আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে স্বোৎসাহে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন— " পেয়েছি, আমি পেয়েছি! মক্কাবাসী দেখ, আমি জমজম কূপ খুঁজে পেয়েছি"। আব্দুল মুত্তালিবের চিৎকারে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা সমবেত হয়ে জমজম কূপ দেখতে পেয়ে আব্দুল মুত্তালিব কে ঘিরে ধরে এবং তারা সম্মিলিত ভাবে দাবী করতে লাগলো যে— "এ কূপ আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসমাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামের, সুতরাং আমরা সকলেই এ কূপের আধিকারিক"। কিন্তু তাদের এমন মন্তব্যে আব্দুল মুত্তালিব বেঁকে বসলেন। আব্দুল মুত্তালিবের দাবী— "এ কূপ আল্লাহ আমাকে স্বপ্নযোগে দেখিয়ে খনন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমি খনন করেছি, সুতরাং এ কূপের অধিকার আমার তবে আমি তোমাদের সবাই কে পানি দেব। অপরাপর গোত্রের লোকেরা আব্দুল মুত্তালিবের একক অধিকার মানতে রাজি হলো না।


কূপের অধিকার নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব ও অপরাপর সকল গোত্রের মধ্যে বেশ তর্ক-বির্তক ও মনোমালিন্য হলো। আধিকারিক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে আব্দুল মুত্তালিবের প্রস্তাবনুযায়ী সবাই বনু সা'দ গোত্রের একজন জ্ঞানী ব্যাক্তির নিকট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যিনি বিষয়টি সমাধান করে দিবেন। 


বনু সা'দ গোত্রের এই জ্ঞানী ব্যাক্তি থাকেন অনেক দূরে।

সিদ্ধান্তনুযায়ী সবাই মিলে যাত্রা শুরু করলো। দূরের পথ। পথ চলতে চলতে একটা সময় পথিমধ্যে মরুভূমিতে পানি ও খাবার ফুরিয়ে যায়। কারো কাছে কোন পানি বা খাবার নেই। মরুভূমিতে পানি ছাড়া জীবন বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। সবাই পানির সন্ধানে ব্যাস্ত সময় অতিবাহিত করেও কেউ কোথাও একফোঁটা পানিও পেল না। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে সবাই মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলো এবং মৃত্যুর পর নিজেদের মৃতদেহ  কাক-পক্ষী, শকুন বা বন্য-হিংস্র জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষা করতে সবাই নিজের জন্য কবর খুঁড়ে রাখলো, যাতে মৃত্যের পর কেউ না কেউ দাফন করতে পারে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণাকাতর, দূর্বিষহ এই কঠিন মুহুর্তে আব্দুল মুত্তালিব দৃঢ়চেতা কন্ঠে হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন— "আল্লাহর কসম! এভাবে মৃত্যুর কাছে হার মানার কোন মানে হয় না। হয়তোবা আল্লাহ আমাদের জন্য অন্য কোথাও পানি রেখেছেন। চলো, আমরা আবার পথ চলতে শুরু করি"। এই বলে আব্দুল মুত্তালিব যখন তার উটের পিঠে চড়লেন তখন উট ঝটকা মেরে খুর দিয়ে মরুবক্ষে আঘাত করলো এবং আল্লাহর কুদরতে মরুবক্ষ চিরে ফিনকি দিয়ে পানি বেরিয়ে আসতে শুরু করলো, যেন এক Oasis।  আশ্চার্যান্নিত হয়ে সবাই বলে উঠলো— আব্দুল মুত্তালিব! একি, তুমি আবার কূপের সন্ধান পেয়েছ? অতপর সবাই পানি পান করলো, নিজেদের মসকগুলো ভরে নিল। সবাই যেন নিজেদের প্রাণ ফিরে পেল।


এ ঘটনার পর কাফেলার কুরাইশদের হৃদয়পটে নতুন এক ভাবনার উদয় হলো। তারা ভাবতে লাগলো— এটা নিশ্চয় আল্লাহর ইশারা, তাই এই নির্জন-বিরাণ মরুভূমিতে আব্দুল মুত্তালিব-ই পানির সন্ধান পেল। সবাই শলা-পরামর্শ করে আব্দুল মুত্তালিব কে বললেন—  "যে আল্লাহ এই মরুভূমিতে তোমাকে পানির সন্ধান দিয়েছেন, তিনিই তোমাকে জমজম দিয়েছেন। সুতরাং তুমিই জমজমের আধিকারিক"। 


অতঃপর তারা আধিকারিক সমস্যা সমাধানের জন্য বনু সা'দ গোত্রের ঐ জ্ঞানী ব্যাক্তির নিকট না গিয়ে মক্কায় ফিরে আসে এবং আব্দুল মুত্তালিব কে জমজম কূপের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। সত্যিকার অর্থেই তৎকালীন সময়ে জমজম কূপ ছিল মক্কাবাসীর জন্য এক Amazing oasis। 


জমজম কূপের পানি পানের দোয়াঃ

নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে জমজম কূপের পানি পান করা উচিত— উচ্চারণ: আল্লাহুমা ইন্নী আসআলুকা ইলমান নাফি'আ ওয়া রিজ কান ওয়াসি'আ ওয়া শিফা আম'মিন কুল্লি দা'ঈ। (হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার নিকট উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সর্বপ্রকার রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি)।


জমজম কূপের পানি পানের নিয়মঃ

ক. কেবলামুখী হয়ে পান করা।

খ. বিসমিল্লাহ ....বলে বা আল্লাহর নাম নিয়ে পান করা।

গ. ডান হাতে পান করা।

ঘ. বসে পান করা।

ঙ. ৩ ধাপে বা ৩ ঢোকে পান করা।

চ. পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে পান করা।

ছ. পানি পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ ....পড়া বা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।

জ. পরিশেষে নিজের চাহিদানুযায়ী দোয়া করা।


জমজম কূপের পানি পানের উপকারিতাঃ

ক. অতুলনীয় স্বাদের বরকতময় পানীয়।

খ. গুন ও মানে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধতম পানীয়।

গ. আত্মিক প্রশান্তি লাভ।

ঘ. তৃষ্ণা, ক্ষুধা নিবারণ ও আরোগ্য লাভ।

ঙ. হজম সহায়ক।

চ. শারীরিক ক্লান্তি দূর করে।

ছ. শরীর সতেজ ও প্রানবন্ত রাখে।

জ. খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। 


জমজম কূপের পানিতে পরীক্ষিত খনিজ উপাদানঃ

"King Saud University" জমজম কূপের পানি পরীক্ষা করে প্রতি লিটার পানিতে নিম্নোক্ত পুষ্টিগুণ ও খনিজ উপাদান নির্ণয় করেছেন—

ক. সোডিয়াম-- ১৩৩ মিলিগ্রাম

খ. ক্যালসিয়াম-- ৯৬ মিলিগ্রাম 

গ. ম্যাগনেশিয়াম-- ৩৮.৮৮ মিলিগ্রাম 

ঘ. পটাশিয়াম-- ৩৩.৪৮ মিলিগ্রাম 

ঙ. ফ্লোরাইড-- ০.৭২ মিলিগ্রাম 

চ. বাইকার্বোনেট-- ৩৬৬ মিলিগ্রাম 

ছ. নাইট্রেট-- ১২৪.৮ মিলিগ্রাম 

জ. ক্লোরাইড-- ১৬৩ মিলিগ্রাম 

ঝ. সালফেট-- ১২৪ মিলিগ্রাম। 


জমজম সম্পর্কে গবেষকের উক্তিঃ

বিখ্যাত জাপানী (বৈজ্ঞানীক) গবেষক মাসারু ইমোতো বলেন— "জমজমের একফোঁটা পানির নিজস্ব যে খনিজ গুনাগুন রয়েছে তা পৃথিবীর অপরাপর পানিতে নেই। সাধারণ পানি ১ হাজার ফোঁটার সাথে জমজমের পানি ১ ফোঁটা মেশানো হলে সেই মিশ্রণও জমজমের পানির মতো হয়ে যায়। জমজমের পানির অণুগুলো অপরাপর পানির তুলনায় বেশ চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ্য। এ পানিতে প্রচুর নিরাময় শক্তি রয়েছে।"


জমজম কূপের পানি পান সম্পর্কিত ভ্রান্তি নিরসনঃ

কেউ কেউ মনে করে থাকেন জমজম কূপের পানি দাড়িয়ে পান করতে হয়, যা একটি ভ্রান্ত ধারণা। সকল পানীয় ও খাবার বসে পান করা বা খাওয়া সুন্নাত, যা শরীয়তের বিধানও বটে। বরং দাড়িয়ে পান করা বা খাওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের কঠোর বিধি-নিষেধ আছে। তবে বসে পান করার আসন বা সুযোগ-সুবিধা না থাকলে কিংবা ওযরবশত বা বিশেষ কোন কারণে দাড়িয়ে পান করা যেতে পারে। 


হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত— "আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জমজমের পানি পান করিয়েছি এবং তিনি তা দাড়িয়ে পান করেছেন"। (সহীহ বুখারী - ১৬৩৭, সহীহ মুসলিম - ২০২৭)।


এই একবার কোন এক লোকসমাগমে ভিড়ের মধ্যে বসে পান করার সুযোগ না থাকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জমজম কূপের পানি দাড়িয়ে পান করেছিলেন বলে হাদিস থেকে জানা যায়।  তাই বলে এটি কোন বিধান নয়, বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযরবশত দাড়িয়ে পান করেছিলেন। স্বাভাবিকবস্থায় বসে পান করাই উত্তম এবং শরীয়তের বিধান। খুব সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই একবার ওযরবশত জমজম কূপের পানি দাড়িয়ে পান করায় কোন না কোন ভাবে আমাদের সমাজ ভুল বার্তা গ্রহণ করেছে।


জমজম কূপের  অবস্থানঃ

জমজম কূপ সৌদি আরবের মক্কা নগরীর মসজিদে আল হারামের অভ্যন্তরে মাতাফ (তাওয়াফের) স্থানে, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে, পবিত্র কা'বা শরীফের ৬৬ ফুট পূর্বে অবস্থিত। জমজম কূপ আগে দৃশ্যমান থাকলেও ২০০৩ সালের পর থেকে দৃশ্যমান নেই, বর্তমানে বেজমেন্টের নিচে কূপের অবস্থান।


জমজম কূপের আয়তনঃ

জমজম কূপ ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট চওড়া এক আয়তক্ষেত্র, যা ৯৮ ফুট মতান্তরে ১২০ বা ১৪০ ফুট গভীর। তবে ৯৮ ফুট গভীর— মতটি-ই সর্বাধিক প্রণিধানযোগ্য।


জমজম কূপের পানির স্তরঃ

জমজম কূপের পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের ১৩ ফুট নিচে অবস্থিত। অতিমাত্রায় ও অবিরত পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর কখনো কখনো ৪৪ ফুটের নিচে নেমে গেলে পানি উত্তোলন বন্ধ রাখা হয় এবং মাত্র ১১ মিনিটে তা পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে এমনটি সচরাচর খুব বেশি হয় না।


জমজম কূপ থেকে উত্তোলিত পানির পরিমাণঃ

সৌদি আরবের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বোর্ডের নথিনুযায়ী Unified zamazemah office-র (ইউনিফাইড জামাজেমাহ দফতর) তথ্যমতে— বৈদ্যুতিক পাম্পের সাহায্যে জমজম কূপ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৮ হাজার লিটার হিসেবে দৈনিক ৬৯ কোটি ১২ লক্ষ লিটার পানি উত্তোলন করা হয়। 


জমজম কূপের পানির উৎসঃ

জমজম কূপে পানি ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক উৎস থেকে নিমিষেই পূণর্ভরণ হয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জমজম কূপে পানি পাথরের ফাটল ও আশপাশের পাহাড়, উপত্যকার বৃষ্টির পানি চুইয়ে জমা হয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ যাই থাকুক না কেন,  মুসলমানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৃহদাংশ জমজম কূপে পানি সরবরাহ বা পূণর্ভরণ প্রক্রিয়াকে আল্লাহর কুদরত বলেই বিশ্বাস ও মান্য করে।


জমজম কূপের প্রবাহকালঃ

জমজম কূপ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীণ ও সক্রিয় কূপ। বলা হয়ে থাকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে  জমজম কূপ প্রবাহিত হয়ে আসছে, তৎনুযায়ী ৫০০০ বছর থেকে এ কূপ অনবরত প্রবাহমান।


জমজম কূপের পানিতে সাধারণ পানি মেশানোঃ

জমজম কূপের পানির সাথে সাধারণ পানি মেশানোর কোন নির্দেশনা নেই বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করেছেন বলে তেমন কোন তথ্যও পাওয়া যায় না। ইসলামী স্কলারগণ মনে করেন—জমজমের পানির মূল বরকত ও ফযিলত পেতে সাধারণ পানি না মিশিয়ে সরাসরি পান করাই উত্তম। তবে - হ্যাঁ! সাধারণ পানি মিশিয়ে পান করাও বৈধ বা জায়েজ, এতে কোন ক্ষতি বা বিধি-নিষেধ নেই। উপরন্তু, আমরা সকলেই জানি ও বুঝি যে— সাধারণ পানি মিশিয়ে পান করলে মিশ্রিত পানির পুষ্টিগুন ও খনিজ উপাদানে অবশ্যই তারতম্য হবে।


জমজম কূপের পানির মেয়াদকালঃ

জমজম কূপের পানি এমন এক বরকতময় ও পবিত্র পানি যা বছরের পর বছর ভাল থাকে, সাধারণত নষ্ট বা গন্ধ হয় না। জমজম কূপের পানি দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক অবস্থায়-ই সংরক্ষণ করা যায়।


জমজম কূপের পানি ঋতুবতী নারীর স্পর্শ করাঃ

হায়েজ, নেফাজ হওয়া বা ঋতুবতী নারীরা অন্য সকল হালাল খাদ্য ও পানীয়-র মতোই জমজম কূপের পানি স্পর্শ ও পান করতে পারবেন, এতে স্পর্শকারীর কোন ক্ষতি অথবা শরিয়তের কোন বাধাঁ বা বিধি-নিষেধ নেই।


জমজম কূপের পানি অমুসলিমদের পান করাঃ

যদিও জমজম কূপ সৃষ্টির ইতিহাস ও অবস্থান মুসলমানদের নবী ও পবিত্র ভূমির সাথে সম্পৃক্ত এবং ধর্মীয় আবেগ ও মূল্যবোধের সাথে জড়িত তথাপি অমুসলিমগণও জমজমের পানি পান করতে পারবে, এতে পানি পানকারীর কোন ক্ষতি অথবা শরিয়তের কোন বাঁধা বা বিধি-নিষেধ নেই। আল্লাহ প্রদত্ত আকাশ-বাতাস, মাটি-পানি, আলো-অন্ধকার, চন্দ্র-সূর্য্য যেমন সকলের জন্য তেমনি জমজম কূপের পানিও সকলের জন্য ।


জমজম কূপের পরিচ্ছন্নতাঃ

সাধারণত যেকোন বদ্ধ পানি তুলনামূলক কম সময়ে পঁচে যায়, নষ্ট হয়, গন্ধ হয় ও রোগ-জীবাণু ছড়ায় কিন্তু জমজম কূপের ৫০০০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ২বার পরিষ্কার করা হলেও এতে কোন শৈবাল, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, জীবানু বা অন্যকোন ময়লা পাওয়া যায়নি। বাস্তবিক অর্থে জমজম পরিষ্কারের কোন প্রয়োজন হয় না, কেনণা জমজমে কোন শৈবাল, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা জীবানু জন্মায় না বা অন্য কোন উপায়েও জমজমের পানি কখনোই নষ্ট হয় না। বলা যায়— জমজমের পরিচ্ছন্নতা প্রাকৃতিক ভাবেই অবধারিত হয়।


জমজম কূপের পানির মান নিয়ন্ত্রণঃ

জমজম কূপের পানির আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ল্যাবরেটরীতে প্রতিদিন পানির মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। দৈনিক নিয়মিত বিরতিতে জমজমের পানির বেশকিছু নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রমজান ও হজ্জ মৌসুমে প্রচুর জনসমাগম ঘটে বলে দৈনিক ১০০টি, কখনো কখনো তারও বেশি নমুনা পরীক্ষা করে মান নিশ্চিত করা হয়।


জমজম কূপের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাঃ Presidency Of the two holly mosques affairs কর্তৃপক্ষের অধীনে মক্কার "কুদাই" এলাকায় অবস্থিত  king abdullah bin abdul aziz Zamzam water distribution plant থেকে ভূগর্ভস্থ পাইপের মাধ্যমে নিয়মিত পানি পরিশোধন করে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববী-তে সরবরাহ হয়। ১৪০৩ হিজরী বা ১৯৮৩ সালে বাদশাহ ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের এক রাজকীয় ফরমাননুযায়ী Saudi hajj & umrah ministry-র সরাসরি তত্ত্ববধানে Unified zamazemah office প্রতিষ্ঠা করে জমজম কূপের পানির গুন ও আন্তর্জাতিক মান তদারকি, অম্লতা পরীক্ষা, বোতলজাত করা, বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা এবং যাবতীয় রক্ষনাবেক্ষন সংক্রান্ত সকল কাজ এই দফতরের অধীনে সম্পন্ন করা হয়। 


মসজিদে আল হারামে জমজমের পানি পান ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে Unified zamazemah office এবং বিমান বন্দরসমূহে এ দায়িত্ব পালন করে Saudi general aviation authority।


জমজম কূপের পানি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞাঃ

King al saud বা সৌদি বাদশাহ কর্তৃক জমজম কূপের পানি বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানি বা ভিন্ন কোন উপায়ে দেশের বাহিরে নেওয়া সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে আল্লাহর ঘর পবিত্র কা'বা-র সম্মানিত মেহমান হিসেবে হজ্ব বা উমরাহ-র যাত্রীরা Saudi general aviation authority -র অধীনে King abdul aziz International airport কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ও নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) লিটার পানি নিতে পারবেন।


জমজম কূপের সংস্কারঃ

জমজম কূপ সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত বহুবার বিভিন্ন খলিফা, সুলতান ও সৌদি বাদশাহদের আমলে পুনর্খনন ও সংস্কার করা হয়। 


প্রাথমিক যুগে কূপটি সৃষ্টির পর বিবি হাজেরা নিজেই পানি সংরক্ষণের জন্য এর চতুর্দিকে বাঁধ দেন এবং এটি-ই সর্বপ্রথম সংস্কার। আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদীর শাসনামলে কূপটির বিশেষ সংস্কার করা হয়।


উসমানীয় খিলাফতের সময়কালে ৯৮২ হিজরীতে সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের শাসনামলে কূপটির বিশেষ সংস্কার করা হয়। ১০৮৩ হিজরীতে সুলতান চতূর্থ আহমেদের শাসনামলে কূপের গম্বুজ সংস্কার করা হয়।১১৮৭ ও ১২০৩ হিজরীতে সুলতান প্রথম আব্দুল হামিদের শাসনামলে কূপের বিশেষ সংস্কার করা হয় ১৩০০ হিজরীতে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের শাসনামলে প্রকৌশলী আস-সায়ীদ মুহাম্মদ সাকী কর্তৃক কূপের গম্বুজের বড় ধরণের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়।


সৌদি আরব সময়কালে ১৯৫৩ সালে বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান আল সৌদের শাসনামলে কূপের পানি উত্তোলনের জন্য পাম্প স্থাপন করা হয়।১৯৬২ (আরেক বর্ণনায় ১৯৬৩ বা ৬৪) সালে বাদশাহ সৌদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে মাতাফ (তাওয়াফের) স্থান সম্প্রসারনের জন্য কূপের ওপরের পুরনো ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং কূপের মুখ মাটির ২.৭ মিটার গভীর বেজমেন্টে নামানো হয়, তখন নিম্নমুখী সিঁড়ি বেয়ে বেজমেন্টে প্রবেশ করে কূপটি সরাসরি দেখা যেত। ১৯৭৩ সালে বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে কূপের বিশেষ সংস্কার কাজ করা হয়। ১৯৭৯ সালে বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে কূপটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে পরিষ্কার করা হয়। ২০০৩ সালে বাদশাহ ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে অতিরিক্ত লোক সমাগমের ভিড় এড়িয়ে হাজীদের যাতায়াত সহজ, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে মাতাফ (তাওয়াফের) স্থান পুনর্সম্প্রসারণের জন্য সেই বেজমেন্টের প্রবেশ পথ ছাদ ঢালাই করে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে কূপের মুখ আর দেখা যায় না, যা সম্পূর্ণভাবে মাতাফের নিচে সুরক্ষিত রয়েছে। ২০১০ সালে বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে কূপের পানি বিশুদ্ধকরণ ও বোতলজাতকরণের আধুনিক প্রকল্প চালু করা হয়। ২০১৭ সালে বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের অধীনে বৃহৎ পরিসরে কূপের তলদেশ পরিষ্কার, জীবাণুমুক্তকরণ ও বিশেষ সার্ভিস প্যাসেজ নির্মাণ কাজের অনুমোদন ও বাস্তবায়ণ সম্পন্ন করা হয়।


আল্লাহ আমাদের সবাইকে আল্লাহর ঘর পবিত্র কা'বা তাওয়াফ ও জমজমের পানি পানে বরকত লাভ করার তাওফিক দিন— আমিন।


লেখক: পল্লী চিকিৎসক ও সমাজকর্মী। 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group