| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

একটি তারিখের অন্বেষা ও আমাদের দায়

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 28-07-2026 ইং
  • 8 বার পঠিত
একটি তারিখের অন্বেষা ও আমাদের দায়
ছবির ক্যাপশন: একটি তারিখের অন্বেষা ও আমাদের দায়


মোহাম্মদ সফিউল হক

ইতিহাস কখনো কখনো এমন এক নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যা শত বছরেও ভাঙে না। কোনো ঘটনা ঘটেছিল-এ কথা আমরা জানি; কিন্তু কবে ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, তার সুনির্দিষ্ট দলিল আমাদের হাতে থাকে না। তখন ইতিহাস কেবল স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, প্রমাণের ওপর নয়। কাজী নজরুল ইসলামের ফেনী আগমনের ইতিহাসও দীর্ঘদিন ধরে ঠিক এমনই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আবদ্ধ ছিল।

আমরা জানতাম, ১৯২৬ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফেনীতে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি ঠিক কোন দিন এসেছিলেন, সে প্রশ্নের কোনো নির্ভরযোগ্য উত্তর এতদিন পাওয়া যায়নি।

আবু হেনা আবদুল আউয়ালের প্রকাশিত দুইটি গ্রন্থে ফেনীতে কবির এই সফরের বিবরণ রয়েছে, কিন্তু সেখানে তাঁর ফেনী আগমনের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই। আবার ফেনীর দুই বিশিষ্ট ব্যক্তি মাহমুদ নুরুল হুদা ও ওবায়েদ- উল হকের স্মৃতিগদ্যেও কোথাও বলা হয়েছে, কবি 'জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে' এসেছিলেন, কোথাও বলা হয়েছে 'জুন-জুলাই মাসে'। ফলে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি অনুমানের গণ্ডি ছাড়াতে পারেনি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কবির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন এবং এই সফরের সঙ্গী মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার যিনি নজরুলকে নিয়ে মূল্যবান স্মৃতিচারণ রেখে গেছেন কিন্তু ফেনী আগমনের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে কিছু লিখে যাননি। ফলে গবেষকদের জন্য একটি বড় শূন্যতা থেকেই যায়।

নজরুলের ফেনী আগমনের শতবর্ষকে সামনে রেখে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি নজরুল-সম্পর্কিত অসংখ্য বই, স্মৃতিকথা, নিবন্ধ ও গবেষণা ঘাঁটতে শুরু করি। কাজ করতে করতেই মনে একটি প্রশ্ন জন্ম নেয়।

১৯২৬ সালে নজরুল প্রথমে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং ৭ দিন অবস্থান করেন। সেখানে তিনি চট্টগ্রাম কলেজে সংবর্ধিত হয়েছেন, আজিজ মঞ্জিলে অবস্থান করেছেন, কবিতা লিখেছেন এবং সেই কবিতার অনেকগুলোতেই নিজেই তারিখ লিখে গেছেন। তাঁর চট্টগ্রাম অবস্থানের সময়কালও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। তাহলে এই ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে কি ফেনী আগমনের দিনটি নির্ণয় করা সম্ভব নয়? সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় এক নতুন অনুসন্ধান।

বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অনলাইন অফলাইন সূত্র খুঁজতে গিয়ে অংরধহ অমব ও উযধশধ ঞৎরনঁহব-এ প্রকাশিত উদয় কুমার দাসের একটি ইংরেজি নিবন্ধ আমার চোখে পড়ে। সেখানে তিনি অত্যন্ত নির্দিষ্টভাবে লিখেছেন-কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের ১ আগস্ট ফেনীতে এসেছিলেন।কিন্তু সমস্যাও ছিল। নিবন্ধে এই তথ্যের কোনো সূত্র বা রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়নি। তারপরও চট্টগ্রামে কবির অবস্থান, চট্টগ্রাম কলেজে সংবর্ধনার সময়, আজিজ মঞ্জিলে তাঁর অবস্থান, সেখানে রচিত কবিতার তারিখ এবং সফরের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে আমার কাছেও ১ আগস্ট তারিখটি যথেষ্ট যৌক্তিক বলে মনে হতে থাকে।

এরই মধ্যে দৈনিক ফেনীর নন্দন কানন সাহিত্য পাতার বিভাগীয় সম্পাদক আলমগীর মাসুদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানতে পারি, দৈনিক ফেনী-এর সাহিত্যপত্র উত্তরকাল-এর আগস্ট সংখ্যাকে 'নজরুল সংখ্যা' হিসেবে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তখন আমার মনে হলো, এটি কেবল একটি পত্রিকার উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে ফেনীর সব সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিয়ে একটি সর্বজনীন কর্মসূচি হওয়া উচিত।

এই চিন্তা থেকেই আমি আমাদের সমতট সাহিত্যাঙ্গনসহ ফেনীর বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এমনকি যে ঐতিহাসিক হক ভিলায় নজরুল কিছু সময় কাটিয়েছিলেন, সেই খান সাহেব বজলুল হকের উত্তরাধিকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া পাইনি। তখন সত্যিই মনে হচ্ছিল-তাহলে কি ফেনীতে নজরুল আগমনের শতবর্ষ ১ আগস্ট যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা সম্ভব হবে না?

ঠিক এই সময়ে জানতে পারলাম, কবি শামীম পাটোয়ারী তাঁর সম্পাদিত মাসিক আনন্দ ভৈরবী পত্রিকার 'নজরুল সংখ্যা' প্রকাশ করছেন। এতে কিছুটা আশার আলো দেখলাম। আমি তাঁকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, "আমিও শতবর্ষ পালন করতে চাই। কিন্তু কোনো দিক থেকেই সহযোগিতা পাচ্ছি না। তাই ফেনী চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগে ২৫ জুলাই অনুষ্ঠান করছি।"

আমি বললাম, "২৫ জুলাই কেন? অনুষ্ঠান তো হওয়া উচিত ১ আগস্ট।"

তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, "আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে? ফেনীতে নজরুল আগমন নিয়ে যেসব লেখা আছে, তার কোথাও তো ১ আগস্টের কথা নেই।"আমি তাঁকে উযধশধ ঞৎরনঁহব-এর নিবন্ধের কথা জানালাম এবং লেখকের নাম ও নিবন্ধের লিংক পাঠিয়ে দিলাম।

এরপর শুরু হয় প্রায় আড়াই ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস অনুসন্ধান।শামীম পাটোয়ারী ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদনা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়রের মাধ্যমে লেখক উদয় কুমার দাসের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর তিনি ‘মাসিক সাগরনাইয়া’র সম্পাদক ও ‘ছাগলনাইয়া মনীষা’ গ্রন্থের রচিয়তা ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন ভাইসহ লন্ডনপ্রবাসী সেই লেখকের সাথে কথা বলেন। লেখকের কাছে তিনি জানতে চান-১ আগস্ট তারিখটির উৎস কী? লেখক কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থের নাম বলতে পারেননি। তবে তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হকের কাছ থেকে তিনি একাধিকবার এই তারিখ শুনেছেন।

এই তথ্য পাওয়ার পর শামীম ভাই আমাকে ফোন করে সব জানালেন এবং বললেন, "আপনি তো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আপনি চেষ্টা করে দেখুন না, কোনোভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় কি না।"

আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু ড. ওমর ফারুক রাসেলের মাধ্যমে বাংলা বিভাগের শিক্ষক স্বপন ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানালেন, অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে তাঁর 'নজরুল তারিখ অভিধান' নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে। সম্ভবত সেই বইয়েই এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তিনি খোঁজ নিয়ে আমাকে পরে জানাবেন বললেন।আমি সঙ্গে সঙ্গে এই তথ্য শামীম পাটোয়ারীকে জানালাম।

কিন্তু শামীম ভাইও থেমে থাকেননি। তিনি বিষয়টি কবি সৌম্য সালেককে জানালেন। সৌভাগ্যক্রমে 'নজরুল তারিখ অভিধান' বইটি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। তিনি বইটির সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার ছবি তুলে শামীম পাটোয়ারীকে পাঠিয়ে দিলেন। আর শামীম ভাই সেটি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড করলেন।মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, অনুসন্ধান, ফোনকল এবং কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের আন্তরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অবশেষে নিশ্চিত হওয়া গেল-কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের ১ আগস্ট ফেনীতে এসেছিলেন।একটি তারিখের অনুসন্ধান এভাবেই শেষ হয়েছিল।

কিন্তু সেই সঙ্গে শুরু হয় আরেকটি প্রশ্ন।

এক শতাব্দী পূর্ণ হওয়ার পরও কি আমরা আমাদের জাতীয় কবিকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি?

যে কবির বিদ্রোহী চেতনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে সাহস জুগিয়েছে, যাঁর সাম্যের দর্শন ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের বিভাজন অতিক্রম করে মানবমুক্তির কথা বলেছে, যাঁর কবিতা ও গান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছিল, যার কবিতা গান গেয়ে জুলাই -সেই নজরুল আজও আমাদের জাতীয় চেতনায় প্রাসঙ্গিক।শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, বৈষম্য, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে নৈতিক সাহস আমরা সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও প্রত্যক্ষ করেছি, তার সঙ্গেও নজরুলের বিদ্রোহী মানবতাবাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ নজরুল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কবি নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন কণ্ঠস্বর।

তবু বেদনার বিষয়, সরকার ঘোষিত 'নজরুল বর্ষ' প্রাশাসনিক কার্যকলাপের অংশ হিসেবে হয়তো পালন করছে কিন্তু ফেনীতে তাঁর আগমনের শতবর্ষ উপলক্ষে কোনো উল্লেখযোগ্য সরকারী উদ্যোগের খবর জানা যায়নি।

স্থানীয় পর্যায়ে সাহিত্য সভা এবং সমতট সাহিত্যাঙ্গন ফেনী পৃথকভাবে ১ আগস্ট এই ঐতিহাসিক দিনটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁদের এই প্রয়াস অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাতীয় কবির জীবনের এমন একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় কি কেবল কয়েকজন সাহিত্যকর্মীর দায়িত্ব হয়ে থাকবে?এই দায় রাষ্ট্রের, স্থানীয় প্রশাসনের, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের, গবেষকদের এবং আমাদের সবার। কারণ, যে জাতি তার ইতিহাসের তারিখ সংরক্ষণ করে না, একদিন সে তার ইতিহাসও হারিয়ে ফেলে। আর যে জাতি তার কবিকে ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে তার বিবেককেও হারায়।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন-অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে, বিভেদের বদলে সাম্যের সমাজ গড়তে, মানুষকে ভালোবাসতে এবং স্বাধীন চিন্তার পক্ষে দাঁড়াতে।তাঁর ফেনী আগমনের শতবর্ষে আমাদের সবচেয়ে বড় দায় কেবল স্মরণসভা আয়োজন নয়; তাঁর পদচিহ্ন সংরক্ষণ, গবেষণাকে উৎসাহিত করা, নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও চেতনা পৌঁছে দেওয়া এবং এই দিনটিকে ফেনীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

এক শতাব্দী পর আমরা একটি হারিয়ে যাওয়া তারিখ উদ্ধার করতে পেরেছি।এখন সময় এসেছে-হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক দায়বোধটিকেও উদ্ধার করার।

লেখক: ব্যাংকার, কবি ও প্রাবন্ধিক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group