নুর উল্লাহ কায়সার:
মানব দেহের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর সিলিকা জেলি মিশ্রিত চিংড়ির সয়লাব চলছে ফেনীর বাজারে। জেলার সর্ববৃহৎ মাছের আড়ৎ থেকে প্রকাশ্যে বিষ মিশ্রিত এসব চিংড়ি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট বাজারে বিক্রি হলেও এ নিয়ে তেমন কোন উদ্যোগ নেই প্রশাসনের। জেলি মিশ্রিত চিংড়ি খেয়ে মানব দেহে ক্যান্সার ও কিডনি বিকলের আশঙ্কা থাকলেও এ নিয়ে নিরব ভূমিকায় আছে ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। মাঝে মধ্যে মাছ বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা অপ্রতুল বলে দাবী ভোক্তাদের। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য পর্যাপ্ত অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগে চাপ দিচ্ছে কনজিউমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
জানা যায়, ফেনীতে বিয়ে সাদীসহ যে কোন ভোজন আয়োজনের মেন্যুতে শোভা পায় বড় আকারের চিংড়ি। প্রতি কেজি হাজার টাকার উপরে দাম হওয়ায় নিম্নবিত্ত পরিবারের পাতে এ চিংড়ির দেখা না মেললেও মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের খাবারের অন্তত মাসে ১দিন হলেও রান্না করা হয় চিংড়ি। ফেনীতে দাম ও চাহিদা বেশি থাকায় অসাধু খামারীরা গলদা চিংড়ি ও বড় আকারের চিংড়িতে ওজন বাড়াতে জেলি পুশিং করে যাচ্ছে। আর ভোক্তারা না জেনে জেলি মিশ্রিত এসব চিংড়ি খেয়ে নানা প্রকারের রোগব্যাধী আক্রান্ত হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষিরা থেকে ফেনীতে প্রতিদিনই আসে বিভিন্ন জাতের বড় চিংড়ি। প্রতিদিন ভোরে ফেনীর সর্ববৃহৎ পৌর মাছের আড়তে চিংড়িবাহী ট্রাকে দেড়-দুই টন বড় জাতের চিংড়িগুলো আনলোড করা হয়। এরপর মাছগুলো ফেনী শহরের বড় বাজার, রেলগেইট বাজারসহ জেলার হাটবাজার গুলোতে চলে যায়। কেজিতে ১৫ পিস ও কেজিতে ১০ পিস আকারের চিংড়িতে খামারেই জেলি পুশ করা হয়।
আড়তদাররা জানায়, মুনাফালোভী খামারিরা সিলিকা পাউডার ও ভাতের মাড় মিশিয়ে ঘন আঠালো জেলি তৈরি করে। এরপর তা সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির মাথা ও শরীরের নরম অংশে পুশ করে। এতে করে প্রতিকেজি মাছে দুই থেকে আড়াইশ গ্রাম ওজন বৃদ্ধি পায়। এসব মাছের মাথা ও শক্ত খোলসের সংযোগস্থলটি আলতো করে ভেঙে বা ফাঁক করে দেখলেই জেলির উপস্থিতি বোঝা যায়।
ভোক্তারা জানায়, শুধু ফেনী শহরের বড় বাজার বা আড়ৎ নয়; ফেনীর কোথাও জেলির মিশ্রণ ছাড়া চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। জেলি মিশ্রিত চিংড়ি খেয়ে ভোক্তাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী নানা জটিল রোগ হলেও মৎস্য বিভাগ, ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও তার কোন ধারাবাহিকতা থাকে না।
এদিকে ফেনীর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (পরশুরাম) সৈয়দ মোস্তফা জামান বলেন, ফেনীর কোথাও চিংড়িতে জেলি পুশ করা হয় না। যেসব খামারে চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেসব স্থানেই মূলত অসাধু চক্র সিরিঞ্জ দিয়ে জেলি পুশ করে থাকে। মৎস্য বিভাগ জেলি মিশ্রিত চিংড়ি বিক্রি ঠেকাতে নানা সময় অভিযান পরিচালনা করে মাছ জব্দ ও বিক্রেতাকে জরিমানা করেছে। এ বিষয়ে মৎস্য দপ্তর সক্রীয় রয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, ফেনীর বাজারে জেলি পুশ করা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে এটা সত্য। বিষয়টি আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটি মজুদ ও বিক্রি বন্ধ করতে অভিযানও চলমান রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে মৎস্য বিভাগের সাথে আলোচনা করে শিঘ্রই আড়ৎদারদের সাথে বসবো। এর মাধ্যমে সমাধান না হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ভূমিকা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না।
অভিযানে যা পেল ভ্রাম্যমান আদালত
ফেনীর হাট বাজারে বিক্রি হওয়া চিংড়িতে জেলির মিশ্রণের প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। জানা যায়, ফেনী বড় বাজার থেকে সম্প্রতি ১২শ টাকা দরে ২ কেজি চিংড়ি ক্রয় করেন এক প্রবাসী। বাড়িতে নিয়ে চিংড়ির মাথায় এবং শরীরে জেলির উপস্থিতি থেকে বিচলিত হন তিনি। একপর্যায়ে তিনি এ চিংড়িগুলো নিয়ে ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক জানার পর তাৎক্ষণিক ফেনীর বড় বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই অভিযানে বাজারে বিক্রির জন্য তোলা সবগুলো চিংড়িতে জেলির উপস্থিতির প্রমাণ পায় ভ্রাম্যমান আদালত। জেলি থাকা চিংড়ি বিক্রির দায়ে ওই অভিযানে কিরণ, দ্বীপক, আলী হোসেন ও হানিফ নামের ৪ মাছ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সাথে ৩০ কেজি চিংড়ি জব্দ করে মাটির নিচে পুঁতে দেয়া হয়।
৬ আগস্ট বিকালে ফেনী পৌরমৎস্য আড়তে ফের অভিযান চালায় ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি দল। এসময় মায়ের দোয়া ফিশিং নামের একটি দোকান থেকে ৩৮ কেজি জেলি মিশ্রিত চিংড়ি জব্দ করা হয়। একইভাবে ২০ জুন ওই মাছের আড়তে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ ফিশিং থেকে ৮০ কেজি জেলি মিশ্রিত চিংড়ি জব্দ করা। এ ঘটনায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।
জেলি মিশ্রিত চিংড়ির ভয়াবহতা জানালেন চিকিৎসক
চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাইফুর রহমান ভূঁঞা বলেন, ফেনীতে সম্প্রতি সময়ে চিংড়ি মাছের মাথা ও শরীরে সিলিকা জেলি পুশ করে বিক্রির কথা শুনে আসছি। সিলিকা জেলি মূলত একটি ক্যামিকেলের নাম। এটি কৃত্রিম উপাদান মিশ্রিত এক ধরনের বিষ। যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এধরনের ক্যামিকেল মিশ্রিত চিংড়ি খেলে মানবদেহে হজমে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, কিডনির কার্যকরিতা হ্রাস, লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘদিন এধনের জেলিমিশ্রিত চিংড়ি খেলে দূরারোগ্য ক্যান্সারের আশঙ্কাও থাকে। দীর্ঘমেয়াদী জটিল এসব রোগ থেকে বাঁচতে এ ধরণের চিংড়ি খাবার টেবিল থেকে বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন এ বিশেষজ্ঞ।
সচেতনতায় জোর দেয়ার তাগিদ ক্যাব’র
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র ফেনী জেলা সভাপতি এডভোকেট পার্থপাল চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফেনীতে প্রতিদিনই জেলি মিশ্রিত চিংড়ি আসছে। প্রশাসন মাঝে মধ্যে বিক্রেতাদের মাঝে অভিযান চালাতে আমরা দেখেছি। কিন্তুু মাছগুলো যে স্থান থেকে আসে এবং যে স্থানে জেলি পুশ করা হয়; সেখানে কাজ হচ্ছে না। তাই অভিযান ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ভোক্তাদের স্বার্থ ও স্বাস্থ্য সু-রক্ষায় আড়ৎদারদের সাথে মতবিনিময় করে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরী। এরপরও কাজ না হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |