এএইচএম মান্নান মুন্না:
বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন ক্যানসারে আক্রান্ত হন বাবা। মা-ও তখন তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কয়েক বছর পর বাবাকেও হারায় তাসফিয়া। একে একে বাবা-মা দুজনকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় ছোট্ট মেয়েটি। সেই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান কৃষক চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস। নিজের সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেই ভাতিজিকে আগলে রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন তিনি।
অভাব-অনটন আর নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সেই তাসফিয়াই এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বিদ্যালয়টির ৩১ বছরের ইতিহাসেও এক অনন্য মাইলফলক। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
বাবা-মাকে হারানোর পর কৃষক চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াসের আশ্রয়ে বেড়ে উঠতে থাকে তাসফিয়া। কৃষিকাজ করে সংসার চালানো চাচার সামর্থ্য ছিল সীমিত। তারপরও নিজের অভাবের কথা না ভেবে ভাতিজির পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণসহ নানা সংকটের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি তাসফিয়ার আগ্রহে কখনো ভাটা পড়েনি।
সহপাঠীদের অনেকেই যখন নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পড়াশোনা করেছে, তখন তাসফিয়াকে এগোতে হয়েছে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে গেছে সে।
ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আনন্দে ভাসে তাসফিয়ার স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করায় তাসফিয়ার এই সাফল্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝেও নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীস চন্দ্র দাস বলেন, তাসফিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। তার জিপিএ-৫ অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাসফিয়ার এই অর্জন আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি দিদারুল ইসলাম সবুজ বলেন, তাসফিয়ার সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। বাবা-মা না থাকার পরও চাচার কাছে থেকে সে যে কঠোর পরিশ্রম করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার মতো শিক্ষার্থীদের পাশে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষের দাঁড়ানো উচিত।
তাসফিয়ার চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, তাসফিয়া ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে। বাবা-মা না থাকায় তার কষ্টটা আমরা বুঝতে পারি। কৃষিকাজ করে নিজের শত অভাবের মধ্যেও তাকে নিজের মেয়ের মতো করে রেখেছি। সে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। তার এই সাফল্যে আমাদের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমি চাই, ভবিষ্যতেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক।
শুধু নিজের জীবন বদলানো নয়, প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের পাশেও দাঁড়াতে চায় তাসফিয়া। ভবিষ্যতে তার স্বপ্ন একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া।
তাসফিয়া বলেন, বাবা-মা না থাকায় ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি। চাচা আমাকে আগলে রেখেছেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। শিক্ষকরাও সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়ে আমি খুব আনন্দিত। ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হতে চাই। আমার মতো যারা কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই এবং পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে চাই।
এদিকে তাসফিয়ার সাফল্যের খবর পৌঁছেছে উপজেলা প্রশাসনের কাছেও। বৃহস্পতিবার তাকে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ডাকা হয়। সেখানে তার পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি কলেজে ভর্তি, প্রাইভেট পড়ানো, যাতায়াত, পোশাক, বই-খাতা ও কলমসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করেছে তাসফিয়া। তার এই সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এটি তার মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। তার স্বপ্ন পূরণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বৃত্তি প্রদানসহ সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। তাসফিয়া যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।
অভাব আর প্রতিকূলতা তাসফিয়ার পথ রোধ করতে পারেনি। বরং বাবা-মায়ের শূন্যতা, চাচার সীমিত সামর্থ্য এবং জীবনের নানা সংগ্রামকে শক্তিতে পরিণত করে সে প্রমাণ করেছে-সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন ছুঁতে পারে একটি শিশু।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |