| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

পাপেট শো ২.০: যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে প্রহসনের মঞ্চ আর নাগরিকেরা পরিণত হয় পুতুলে

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 05-08-2026 ইং
  • 37 বার পঠিত
পাপেট শো ২.০: যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে প্রহসনের মঞ্চ আর নাগরিকেরা পরিণত হয় পুতুলে
ছবির ক্যাপশন: পাপেট শো ২.০: যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে প্রহসনের মঞ্চ আর নাগরিকেরা পরিণত হয় পুতুলে



ইমরান ইমন


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-য় দেখিয়েছেন, মানুষ মনে করে সে নিজের ইচ্ছাশক্তির বলেই জীবন পরিচালনা করছে। অথচ বাস্তবে ক্ষমতা, লোভ, সামাজিক কাঠামো ও নিয়তির অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা এক পুতুলের মতোই সে নিয়ন্ত্রিত হয়। 


আজকের বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের রাজনীতির দৃশ্য দেখলে মনে হয়, সেই পুতুলনাচ থামেনি; শুধু মঞ্চ বদলেছে, পুতুলের পোশাক পাল্টেছে আর সুতো টানার কৌশল আরও আধুনিক হয়েছে।


এখনকার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—পুতুলেরা নিজেদের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে। সংসদে, টকশোতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা দলীয় কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে তারা এমনভাবে চিৎকার করে যেন তারাই ইতিহাসের চালক। অথচ দর্শক জানে, সংলাপ আগে থেকেই লেখা। কখন হাততালি দিতে হবে, কখন ক্ষুব্ধ হতে হবে, কখন দেশপ্রেমিক সাজার অভিনয় করতে হবে—সবই নির্ধারিত। কেবল মাঝেমধ্যে সুতো জট বেঁধে গেলে নাটকটা একটু বাস্তব মনে হয়।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে পুতুলনাচ ছিল জমিদার, সামাজিক ভণ্ডামি ও শ্রেণি-শোষণের প্রতীক। আজ সেই জায়গা দখল করেছে কর্পোরেট ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক প্রভাব, দলীয় অন্ধত্ব আর মিডিয়ার কৃত্রিম উত্তেজনা। 


এখন রাজনীতিবিদেরা জনগণের ভাষায় কম কথা বলেন বরং ক্যামেরার ভাষায় কথা বলেন। যেন প্রতিটি বক্তব্য আসলে ভোটের জন্য নির্মিত বিজ্ঞাপন। বাস্তবতার চেয়ে ‘ইমেজ‘ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষ বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য আর অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত—কিন্তু মঞ্চে তখনও আলো ঝলমলে পুতুলনাচ চলছে।


সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই পুতুলনাচে দর্শকরাও ধীরে ধীরে পুতুলে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এখন নতুন যুগের সুতো। মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করছে ভেবে আসলে পূর্বনির্ধারিত রাগ, ঘৃণা ও বিভাজনের পুনরাবৃত্তি করছে। একদল অন্য দলকে দেশদ্রোহী বলে, আরেকদল প্রথম দলকে ফ্যাসিস্ট বলে। কিন্তু দুই পক্ষই হয়তো একই অদৃশ্য মঞ্চের দুই পাশে দাঁড়ানো চরিত্র মাত্র।


বর্তমান রাজনীতির আরেকটি ব্যঙ্গাত্মক দিক হলো: এখানে আদর্শের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু আদর্শের অভিনয় বেঁচে আছে। যে নেতা গতকাল গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, আজ তিনিই ভিন্নমত দমনে ব্যস্ত। যে দল একসময় স্বাধীন মতপ্রকাশের দাবি তুলেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারাই সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেয়। যেন সবাই একই স্ক্রিপ্ট পড়ছে, শুধু দলের নাম পাল্টে যাচ্ছে।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো তিনি নতুন করে লিখতেন—“পুতুল নাচের আপডেটেড সংস্করণ”। সেখানে কাঠের পুতুলের বদলে থাকত ডিজিটাল অবতার, রাজনৈতিক ইনফ্লুয়েন্সার, টেলিভিশনের চিৎকাররত বিশ্লেষক আর বিদেশি স্বার্থের অদৃশ্য পরিচালক। 


কিন্তু উপসংহার সম্ভবত একই থাকত: মানুষ তখনই মুক্ত, যখন সে নিজের সুতো দেখতে পায়। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পুতুলনাচ সেটাই, যেখানে পুতুলেরা বিশ্বাস করে—তারা স্বাধীন।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group