| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 30-06-2026 ইং
  • 5 বার পঠিত
পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা
ছবির ক্যাপশন: পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা


-রাশেদুল হাসান

মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশের পাপেট বা পুতুলনাট্যের ইতিহাসে অনন্য একটি নাম। তিনি ‘পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত। চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তার পরিচয় যতটা উজ্জ্বল, পাপেট শিল্পের বিকাশে তার অবদানও ততটাই অনন্য। দেশের লোকজ পুতুলনাট্যকে আধুনিক মঞ্চে এনে শিশুদের শিক্ষা, বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে ছিল তার দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস প্রচেষ্টা।

ষাটের দশক থেকে পাপেট নিয়ে কাজ শুরু করেন মুস্তাফা মনোয়ার। সে সময় বাংলাদেশে পাপেট মূলত গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির অংশ ছিল। তিনি দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক নাট্যরীতি, আলোকসজ্জা, সঙ্গীত ও গল্প বলার কৌশলের সমন্বয় ঘটিয়ে পাপেটকে নতুন মাত্রা দেন। ফলে পুতুলনাট্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম না থেকে শিশুদের সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধ গঠনের একটি কার্যকর শিক্ষামাধ্যমে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি পাপেটকে ব্যবহার করেন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে। ভারতের শরণার্থী শিবিরে পাপেট প্রদর্শনীর মাধ্যমে যুদ্ধের চিত্র, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের মনোবল জাগিয়ে তোলার কাজ করেন।

‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ ও ‘একজন সাহসী কৃষক’সহ তার বিখ্যাত পাপেট শোগুলো দর্শকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার পরিকল্পনা ও নির্মাণে প্রচারিত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ দীর্ঘদিন দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। পাপেটের মাধ্যমে গল্প, লোককাহিনি, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক বার্তা তুলে ধরার এ উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের কাছে পুতুলনাট্যকে পরিচিত ও আকর্ষণীয় করে তোলে। বিশেষ করে বাংলা লোককাহিনি ও দেশীয় সংস্কৃতিকে শিশুদের সামনে সহজভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এ অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে পাপেট শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার হাত ধরে দেশে পাপেট নির্মাণ, পাপেট পরিচালনা এবং পাপেটভিত্তিক নাট্যচর্চার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়।

শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের মতো বিষয়গুলো তিনি পাপেটের মাধ্যমে সহজ ও আনন্দময়ভাবে তুলে ধরেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, আনন্দের মধ্য দিয়েই শিশুদের সবচেয়ে কার্যকরভাবে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা মনে করেন, বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের যে ভিত্তি আজ দৃশ্যমান, তার বড় অংশই মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে নির্মিত। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং একটি শিল্পধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদাতা। তার সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা শিল্পীরাই আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাপেট শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

১৯৮৪ সালে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে একটি অনুষ্ঠানে এসে প্রখ্যাত কবি পূর্ণেন্দু পাত্রী বলেছিলেন, ‘একটা দেশের জন্য একজন মুস্তফা মনোয়ারই যথেষ্ট’। 

মুস্তাফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন। পরে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় পারফর্মিং আর্টস একাডেডি, জাতীয় সমপ্রচার একাডেডি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে বিটিভির জাতীয় টেলিভিশন প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরুর পেছনেও তার অবদান রয়েছে।

বাংলাদেশ থিয়েটার পাপেট অ্যান্ড এনিমেশনের তিনি পরিকল্পক, গবেষক ও উদ্ভাবক। তার পাপেট শিল্প সুর, কথা, গান, অভিনয়, চিত্রকলা, কবিতা সব শিল্পকে ধরে আছে। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে তার। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে প্রচারিত তার ‘পাপেট’ এর মাধ্যমে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘ক’ ও ‘খ’ জাপানে ও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের টিভি অনুষ্ঠান প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৮২ সালে তিনি কলম্বোয় ‘এনিমেশন অ্যান্ড পাপেট ফর টেলিভিশন’ বিষয়ক আনত্মজার্তিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।

মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group