| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

কুরবানীর অর্থ ত্যাগ, অদৃশ্য প্রতিযোগিতা নয়

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 24-05-2026 ইং
  • 528 বার পঠিত
কুরবানীর অর্থ ত্যাগ, অদৃশ্য প্রতিযোগিতা নয়
ছবির ক্যাপশন: কুরবানীর অর্থ ত্যাগ, অদৃশ্য প্রতিযোগিতা নয়


সোলায়মান হাজারী ডালিম :

প্রথমে একটা গল্প বলি- পরে মূল আলোচনায় আসি। 

মানুষটা ফেনীর সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি এলাকায় গ্রামের রাস্তায় ব্যাটারি চালিত একটা টমটম চালান। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসারটা চলে। গেল রমজানের আগেই অনেক কষ্টে, ধার-দেনা করে আদরের মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন। তারপর রমজান আর ঈদ মিলিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির জন্য প্রায় ৩০ হাজার টাকার সওদা পাঠিয়েছেন।

সামনে ঈদুল আজহা। কুরবানির ঈদ। অথচ নিজের ঘরে কুরবানি হবে কি না, সেটাই এখনো নিশ্চিত না মানুষটার।

এরই মাঝে মেয়ে বাবাকে জানিয়েছে- শ্বশুরবাড়ির ফ্রিজটা ছোট। ঈদে ছাগল না দিয়ে যেন একটা বড় ফ্রিজ কিনে দেওয়া হয়। কারণ কুরবানির গরুর মাংস রাখতে সমস্যা হয়।

কথাটা মেয়েটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছে। হয়তো সে বুঝতেই পারেনি, এই একটা আবদারের পেছনে তার বাবার বুকের ভেতরটা কেমন করে হুহু করে উঠেছে।

যে মানুষটা সারাদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে টমটম চালায়, রাতে বাড়ি ফিরে হিসেব মেলায়-চাল কিনবে, না ওষুধ কিনবে-সেই মানুষটাকেই এখন ভাবতে হচ্ছে, নিজের কুরবানির স্বপ্ন বাদ দিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির জন্য ফ্রিজ কিনতে হবে।

তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি কুরবানি দেবেন?

মানুষটা শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “কিভাবে সম্ভব বলেন, এই সমাজে এমন অসংখ্য বাবা আছেন, যারা নিজেরা নতুন কাপড় না কিনেও মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উপহার পাঠান।নিজের ঘরে কুরবানি না হলেও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কুরবানির মাংস রাখার জন্য ফ্রিজ কিনে দেওয়ার চাপ নেন।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক সময় সেই কলিজার টুকরো মেয়েটাও বুঝতে পারে না- তার ছোট্ট একটা আবদারের জন্য বাবার বুকের ভেতর কতটা রক্তক্ষরণ হয়। আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি এই বাবা মেয়ের ইচ্ছে পুরণের জন্য হয় জমি বিক্রি করবেন না হয় মোটা সুদে লোন করবেন।

বাবারা আসলে এমন-ই। তারা নীরবে ভাঙেন, তবুও সন্তানের মুখে হাসি রাখতে চান। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, সামর্থ্য-সবকিছু চাপা দিয়ে হলেও সন্তানের সুখটাই আগে ভাবেন।

ঈদ মানেই আনন্দ। কুরবানির ঈদ মানেই ত্যাগের শিক্ষা, সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা। অথচ আমাদের সমাজে এই ঈদকে ঘিরে ধীরে ধীরে এমন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ত্যাগের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে সামাজিক চাপ, লোকদেখানো আয়োজন আর মেয়ের বাবার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অসহনীয় দায়।

গ্রামের সেই টমটম চালানো বাবার গল্পটা আসলে কোনো একক মানুষের গল্প নয়। এ দেশের হাজারো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বাবার জীবনের প্রতিচ্ছবি। 

যারা সারাজীবন নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। মেয়ের বিয়েতে ধার-দেনা করেন, জমি বিক্রি করেন, সমিতি থেকে ঋণ নেন, তবুও যেন দায়িত্ব শেষ হয় না।

বিয়ের পরও এক অদৃশ্য সামাজিক রীতির কারণে তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় নতুন নতুন চাহিদা।

কুরবানির ঈদ এলেই এই চাপটা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গরু পাঠাতে হবে, না পারলে অন্তত ছাগল। সঙ্গে নতুন কাপড়, মসলা, ফলমূল, কখনো নগদ টাকা, কখনো আবার ফ্রিজ, টেলিভিশন কিংবা আসবাবপত্র। 

সমাজ এটাকে “ভালোবাসা” বা “সম্মান” বলে চালিয়ে দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এটি এক ধরনের নীরব নির্যাতনে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই চাপ অনেক সময় সরাসরি আসে না। আসে ইঙ্গিতে, তুলনায়, সামাজিক রীতির নামে। “ওই বাড়ি থেকে এটা এসেছে”, “মেয়েকে তো কিছু দিতেই হয়”, “শ্বশুরবাড়ির সম্মান রাখতে হবে”-এই কথাগুলোই একজন বাবার বুকের ভেতর গভীর আতঙ্ক তৈরি করে। তিনি তখন নিজের সামর্থ্যরে কথা ভাবতে পারেন না। ভাবেন শুধু, মেয়েটা যেন শ্বশুরবাড়িতে ছোট না হয়।

এই ভয় থেকেই একজন বাবা নিজের কুরবানি বাদ দেন, ঋণ নেন, সুদের টাকার বোঝা কাঁধে তোলেন, এমনকি শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দেন। অথচ ইসলাম কখনো এমন চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতিকে সমর্থন করে না। কুরবানি একটি ইবাদত, সামর্থ্য অনুযায়ী পালন করার বিষয়। সেখানে কারও ওপর সামাজিক প্রতিযোগিতা বা উপহারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ধর্মের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আজকাল দেখা যায়, অনেক পরিবার মেয়ের বাবার আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা না করেই একের পর এক প্রত্যাশা করে। কেউ সরাসরি বলে, কেউ আবার পরিস্থিতি এমন করে তোলে যাতে না দিলেও মেয়েটি মানসিক চাপে পড়ে। আর মেয়েটিও অনেক সময় বুঝতে পারে না, তার ছোট্ট একটি আবদারের পেছনে বাবার কত রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

একটা ফ্রিজ হয়তো কারও কাছে সাধারণ জিনিস। কিন্তু একজন টমটম চালকের কাছে সেটি মানে কয়েক মাসের উপার্জন। মানে নতুন ঋণ। মানে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন। মানে হয়তো কুরবানির পশু কেনার স্বপ্নটুকু মাটি চাপা দেওয়া।

আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত অনুভূতির নাম সম্ভবত “বাবা”। মায়েদের কষ্ট আমরা সহজে বুঝতে পারি, প্রকাশ করি। কিন্তু বাবারা কাঁদেন নীরবে। তারা মুখে হাসি রেখে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন। সন্তানের জন্য সব করতে করতে একসময় নিজেদের ইচ্ছা, স্বপ্ন, এমনকি সম্মানবোধটুকুও বিসর্জন দেন।

এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ঈদ উপলক্ষে ভালোবাসা থেকে কিছু পাঠানো যেতে পারে, কিন্তু সেটি কখনো সামাজিক বাধ্যবাধকতা হতে পারে না। কোনো বাবা যেন নিজের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে শুধু লোকলজ্জার ভয়ে ঋণের বোঝা না নেন। কোনো মেয়ের সুখ যেন বাবার চোখের পানি দিয়ে কিনতে না হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েদেরও বুঝতে হবে-বাবার সামর্থ্যরে চেয়ে বড় কোনো আবদার পৃথিবীতে নেই। বাবার ভালোবাসা কখনো ফ্রিজ, গরু বা উপহারের মাপে বিচার করা যায় না। যে বাবা সারাজীবন কষ্ট করে মেয়েকে মানুষ করেছেন, তার শেষ বয়সটাকে আরও কঠিন করে তোলা ভালোবাসা নয়।

কুরবানির ঈদ আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। সেই ত্যাগ যদি দেখাতেই হয়, তাহলে আসুন আমরা সামাজিক অহংকার, অপ্রয়োজনীয় প্রথা আর অন্যের সামর্থ্যরে ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতিকে কুরবানি করি। তাহলেই হয়তো কোনো টমটম চালানো বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে বাধ্য হবেন না-“কিভাবে সম্ভব বলেন।

লেখক- গণমাধ্যম কর্মী।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group