ফেব্রুয়ারি এলে বাংলার সময় যেন একটু থেমে দাঁড়ায়। ক্যালেন্ডারের একটি মাস তখন ইতিহাসের দরজায় পরিণত হয়—যেখানে প্রবেশ করলেই শোনা যায় পদচারণার শব্দ, মিছিলের ধ্বনি, আর গুলির পর নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া তরুণ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। রাতের অন্ধকার ভেঙে যখন প্রভাতফেরির সারি শহীদ মিনারের দিকে এগোয়, তখন মনে হয়—এই পথ কেবল ফুল দেওয়ার পথ নয়, আত্মপরিচয়ের দিকে ফিরে যাওয়ার পথ।
একুশ তাই স্মরণ নয়, আত্মজিজ্ঞাসা। প্রশ্ন—ভাষার জন্য যে জাতি রক্ত দিয়েছে, সেই জাতি কি তার চেতনা ধারণ করতে পেরেছে?
ভাষা: অস্তিত্বের অন্য নাম
রাষ্ট্রভাগের রাজনৈতিক রেখা মানুষের মানচিত্র বদলালেও সংস্কৃতির ইতিহাস বদলাতে পারে না। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীয়ীকরণের প্রচেষ্টা, কিন্তু বাঙালির কাছে তা ছিল সাংস্কৃতিক অস্বীকৃতি।
বাংলা ভাষা তখন কেবল ভাষা ছিল না; ছিল স্মৃতি, সাহিত্য, লোকজ ঐতিহ্য, নদীমাতৃক জীবনের ছন্দ এবং বহমান সভ্যতার ধারাবাহিকতা। ভাষার ওপর আঘাত মানে ছিল মানুষের অন্তর্গত জগতে আঘাত। তাই প্রতিবাদ জন্ম নিয়েছিল স্বাভাবিক এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়।
রাষ্ট্রের শক্তি বনাম মানুষের কণ্ঠ :
শাসকগোষ্ঠী ইতিহাসের পুরোনো কৌশলই গ্রহণ করেছিল—নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, ভয় প্রদর্শন। ১৪৪ ধারা জারি করে জনতার কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে মানুষ নীরব থাকতে শেখেনি।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির সেই দিনগুলোতে ছাত্ররা যখন নিষেধাজ্ঞা ভেঙে রাজপথে নেমেছিল, তখন তারা কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ করেনি; তারা উচ্চারণ করেছিল মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের গুলি সেই উচ্চারণ থামাতে পারেনি; বরং ইতিহাসে তাকে অমর করে দিয়েছে।
রক্ত ঝরেছিল, কিন্তু সেই রক্ত পরাজয়ের নয়—চেতনার জন্মরক্ত।
ছাত্র থেকে জনতা: আন্দোলনের রূপান্তর
ভাষা আন্দোলনের বিস্ময়কর দিক ছিল এর দ্রুত সামাজিক বিস্তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের জীবনে। দোকানপাট, কারখানা, শিক্ষাঙ্গন—সবখানেই ভাষার প্রশ্ন ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল।
এই আন্দোলন কোনো মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পদ ছিল না। এখানে ছিল বহুমতের মিলন, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ভাষা তখন রাজনৈতিক স্লোগান নয়; আত্মমর্যাদার প্রতীক।
রাজধানী ছাড়িয়ে দেশজুড়ে প্রতিধ্বনি :
ঢাকার রাজপথে শুরু হওয়া আন্দোলনের ঢেউ দ্রুত পৌঁছে যায় বিভিন্ন জেলা ও জনপদে। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে জাতীয় চরিত্র দেয়। ভাষা এক অদৃশ্য বন্ধনে মানুষকে যুক্ত করে—যেখানে অঞ্চলগত দূরত্ব অর্থহীন হয়ে যায়।
একটি জাতি তখন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করে।
রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আত্মচেতনার উন্মেষ
যে তরুণরা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিল, তারা হয়তো জানত না ইতিহাস তাদের কী নামে স্মরণ করবে। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ বাঙালির রাজনৈতিক আত্মচেতনাকে জাগিয়ে তোলে। ভাষার সংগ্রাম ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়।
একুশ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি জাতিসত্তার দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা।
ঐক্যের বিরল মুহূর্ত :
ভাষা আন্দোলনের সময় সমাজে যে ঐক্যের জন্ম হয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। দল, মত, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থান—সব বিভাজন অস্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। মানুষের প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছিল ভাষাভিত্তিক মানবিক সংহতি।
আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই ঐক্যের স্মৃতি আমাদের বিব্রত করে—কারণ আমরা ক্রমেই বিভক্ত হওয়ার শিল্পে দক্ষ হয়ে উঠছি।
ভাষার বিজয় ও বিশ্বমানবতার স্বীকৃতি:
অবশেষে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে—যা ছিল জনগণের নৈতিক বিজয়। পরবর্তীকালে একুশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করলে ভাষা আন্দোলন বিশ্বমানবতার ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।
একটি জাতির আত্মত্যাগ তখন বিশ্বজুড়ে ভাষাগত অধিকার ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনীতির ছায়া ও চেতনার সংকট:
সময়ের প্রবাহে একুশের স্মৃতি কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে আবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক, শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতাকে কেন্দ্র করে বিভাজন—এসব একুশের সার্বজনীনতাকে সংকুচিত করে।
শহীদ মিনার, যা হওয়া উচিত ছিল নীরব সম্মিলনের স্থান, কখনো কখনো হয়ে ওঠে মতবিরোধের প্রতীক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্মৃতির পবিত্রতা।
বহুভাষিক বাস্তবতা ও আমাদের দায়বোধ:
একুশ আমাদের শেখায়—প্রতিটি ভাষাই মানবসভ্যতার সম্পদ। অথচ দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি, তা কি আমরা অন্য ভাষার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করছি?
চেতনা তখনই সত্য হয়, যখন তা সর্বজনীন হয়।
পাঠ্যপুস্তক ও অনুভূতির অনুপস্থিতি :
শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষা আন্দোলন উপস্থিত থাকলেও তার আবেগ অনেক সময় অনুপস্থিত। ইতিহাস তথ্য হয়ে যায়, অনুভব হয়ে ওঠে না। ফলে নতুন প্রজন্ম জানে, কিন্তু উপলব্ধি করে না।
যে ইতিহাস হৃদয়ে পৌঁছায় না, তা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারে না।
আত্মসমালোচনার প্রয়োজন :
আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, কিন্তু ভাষার মর্যাদা রক্ষায় কতটা সচেতন? দৈনন্দিন জীবনে ভাষার অবহেলা, সাংস্কৃতিক অনুকরণের প্রবণতা এবং ভাষাবোধের ক্রমহ্রাস আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
একুশ কেবল স্মৃতিচারণের দিন নয়; এটি ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিদিনের অনুশীলন।
করণীয়: চেতনার পুনরাবিষ্কার
একুশকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন— ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রাখা। শিক্ষায় ইতিহাসের মানবিক দিককে গুরুত্ব দেওয়া। ক্ষুদ্র ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ সাংস্কৃতিক চর্চার বিস্তার। শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা। দৈনন্দিন জীবনে ভাষার সৌন্দর্য ও শুদ্ধতার চর্চা। একুশ—এক চলমান প্রতিশ্রুতি একুশ কোনো সমাপ্ত ইতিহাস নয়; এটি চলমান প্রতিশ্রুতি। ভাষা আমাদের চিন্তার আশ্রয়, স্মৃতির ভান্ডার, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। শহীদের রক্তে লেখা সেই প্রতিশ্রুতি আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা শুরু হয় ভাষা থেকে।
ফুল শুকিয়ে যায়, অনুষ্ঠান শেষ হয়, কিন্তু চেতনা যদি জাগ্রত থাকে, তবে একুশ কখনো ফুরায় না।
তাই প্রশ্নটি আজও অনিবার্য—আমরা কি একুশকে ধারণ করেছি? হয়তো সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু যতদিন আমরা ভাষার মধ্যে মানুষকে খুঁজে নেব, ততদিন একুশ আমাদের আত্মপরিচয়ের আয়নায় ফিরে তাকাতে বাধ্য করবে।
লেখক : বাচিক শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিক।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |