| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

সাহিত্যের বরপুত্র ফেনীর জিন্নাহ চৌধুরী

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 08-08-2026 ইং
  • 20 বার পঠিত
সাহিত্যের বরপুত্র ফেনীর জিন্নাহ চৌধুরী
ছবির ক্যাপশন: সাহিত্যের বরপুত্র ফেনীর জিন্নাহ চৌধুরী

 অনুলেখন: জসিম মাহমুদ   

হযরত আমির উদ্দিন পাগলা মিয়ার (রহঃ) স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি ফেনীর উর্বর মাটি যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে বহু জ্ঞানী- গুণী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের। আমরা এসব গুণীদের কেউ চিনেন, কেউ চিনেননা। নাম শুনলেও বিস্তারিত জানেনা। ফলে আমাদের ফেনীর নতুন প্রজন্ম ফেনীর গুণীদের ব্যাপারে একেবারেই অন্ধকারে রয়েছেন। এসব গুণীদের সংখ্যা অসংখ্য। তারা সকলে জীবিত নাই। প্রয়াত হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু যারা এখনও সৃষ্টিশীল কাজের সাথে জড়িত রয়েছেন, আলো ছড়াচ্ছেন স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে সমসাময়িক (জীবিত) এসব সৃষ্টিশীল বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে দৈনিক স্টার লাইন পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে তাদের জীবনালেখ্য তুলে ধরবে। তারই অংশ হিসাবে আজ পত্রস্থ হয়েছে সৃষ্টিশীল মানুষ আজিজুল বারী জিন্নাহ  চৌধুরীর জীবনালেখ্য। 

সাহিত্যজগতে পরিচিতমুখ জিন্নাহ চৌধুরী। তাঁর প্রকৃত নাম আজিজুল বারী চৌধুরী। দেশের অন্যতম শিল্পোদ্যোক্তা জিন্নাহ চৌধুরী। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) প্রতিষ্ঠিত শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান "জে অ্যান্ড জে ইন্ডাস্ট্রিজ "লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। স্নাতকোত্তর শেষে কর্মজীবন শুরু করেন একটি বিদেশি কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। এরপর ঢাকার বনানীতে অবস্থিত "এঙ্পোর্ট  এজেন্সির" (বায়িং হাউজ) বেনাপোল স্থল বন্দরে মহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হন। তখন থেকে তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৯২ সালে যোগ দেন সিইপিজেডস্থ পদ্মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অংশীদার পরিচালক হিসেবে। সেখান থেকে তৈরি পোশাক, জুতা, তাবু তৈরির এঙ্সেরিজ প্রতিষ্ঠান "মেঘনা এঙ্সেরিজ লিঃ"এইচ ইউ এঙ্সেরিজ লিঃ, পদ্মা এঙ্সেরিজ লিমিটেড নামে আরো তিনটি শিল্প প্রতিষ্ঠান সিইপিজেডে গড়ে তোলেন। এরপর ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জে অ্যান্ড জে ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ, এখানে উৎপাদিত তৈরি পোশাক, জুতা, তাবু ইত্যাদির এঙ্সেরিজ পণ্য নামীদামি বায়ারের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি হয়। জিন্নাহ চৌধুরী বাংলাদেশ ইনভেস্টার এসোসিয়েশনের (বেপজিয়ার) একজন নির্বাচিত পরিচালক, এটি ইপিজেড এ অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সংগঠন। এই সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছে পুরো বাংলাদেশের আটটি ইপিজেড এর প্রায় তিন শত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকেরা ২০২০-২১ সালে চট্টগ্রাম, কর্ণফুলী, কুমিল্লা ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত বেপজিয়ার সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। এই সংগঠনের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন ইয়াংওয়ান গ্রুপের মালিক দঃ কোরিয়ার নাগরিক জনাব কিহাক সং।

জন্ম ও শৈশব : 

কবি, গল্পকার, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক জিন্নাহ চৌধুরী বাংলাসাহিত্যে পরিচিত নাম। তিনি ১৯৬৫ সালের ১ মার্চ ফেনীর মুন্সিরহাটস্থ উত্তর শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম লুৎফর রহমান চৌধুরী (মরহুম) ও মা আকিকের নেছা চারু। বাবা-মায়ের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি প্রথম। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন ডানপিঠে। শৈশবে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ছড়া, কবিতা, আবৃত্তি, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেক পুরস্কার অর্জন করেন। তখন থেকে পিতার দেয়া নাম আজিজুল বারী চৌধুরীর পরিবর্তে জিন্নাহ চৌধুরী নামে পরিচিত হতে থাকেন।

শিক্ষাজীবন:

জিন্নাহ চৌধুরী ফেনীর মুন্সিরহাটস্থ আলী আজম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শিক্ষা জীবনের প্রাতষ্ঠানিক হাতেখড়ি ঘটে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তিনি মুন্সিরহাট ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায়  ভর্তি হয়ে দাখিল ও আলিম পাশ করেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ঢাকা হতে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তখনো এস এস সি, এইচ এসসি ডিগ্রি সমমান নাহওয়ায়  এরপর তিনি ফেনী সরকারি কলেজে  উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৮৩ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।  ১৯৮৬ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলা বিভাগের প্রাক্তনীদের সংগঠন ‘বাঙলা সম্মিলনে’র এক দশকের অধিক ধরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।   

পরিবার:

জিন্নাহ চৌধুরী ১৯৯২ সালের ৯ এপ্রিল তানজিনা চৌধরী হীরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ছোটবেলায় নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দুই মেয়ে আফরিদা আজিজ প্রীতম ও ফাহমিদা আজিজ প্রমিতি কানাডার সেনেকা কলেজ ও ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ওখানে প্রমিতি নামীএকটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।প্রিতম ইংল্যান্ডে পি এচ ডি করছে। একমাত্র ছেলে লুৎফুল বারী চৌধুরী প্রান্ত মালেয়শিয়ার সনওয়ে কলেজ হতে এ লেভেল করে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডারস ইউনিভার্সিটিতে বিজনিসে অনার্স করছে। জিন্নাহ-হীরা দম্পতির মেয়ে প্রীতম এক সময়কার জনপ্রিয় জাতীয় টেলিভিশন শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’র সাধারণ নৃত্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।   

সংগঠক:

পেশাগত জীবনের বাইরে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘কবি ও কবিতা’র উপস্থাপক। বাংলাদেশ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি। এছাড়াও সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক সংগঠন চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক জিন্নাহ চৌধুরী অসংখ্য সংগঠনের সাথে জড়িত। 

ভ্রমণ। 

ভ্রমন প্রিয় মানুষ জিন্নাহ চৌধুরী আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, দঃ কোরিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, উজবেকিস্তান,মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, হংকং, ফিলিপাইন, সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত সহ পৃথিবীর অনেক দেশে ভ্রমণ করেন। 

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ : 

কবিতা 

১. হরিণ চোখে প্রজাপতি 

২. বুকের ভেতর পূর্ণিমা চাঁদ 

৩. মোহে নয় মুগ্ধতায় আছি 

ছড়া : 

১. প্রজাপতি 

২. কোন পথে যায় তারা। 

গল্প :

১. মধ্যরাতের স্বপ্নভঙ্গ (বড়দের জন্য) 

২. বাবর আলীর বাঘ শিকার (ছোটদের)

৩. গল্প শোনো শেয়ালের (ছোটদের) 

ছোটদের জীবনী: 

১. দুঃখী এক রাজপুত্রের গল্প 

২. ছোটদের শমসের গাজী 

প্রবন্ধ :  

চর্যাপদের হরিণী 

সম্পাদনা : 

১. নিম্নচাপ কবিতা পত্র 

২. প্রমোদ 

৩. ফেনী জেলা সমিতির বার্ষিকী 

৪. শতাব্দীর বি. শব্দমালা 

পুরস্কার ও সম্মাননা : 

১. কথাসাহিত্য সংসদ, ঢাকা 

২. অর্চি শিশু সাহিত্য পুরস্কার চট্টগ্রাম 

৩. কবিতা নিকেতন সাহিত্য পুরস্কার ফেনী

৪. কবিতা ঘর লন্ডন। 

কবি জিন্নাহ চৌধুরী শিশুসাহিত্য দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও ছড়া ও কিশোর কবিতার প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক কবিতায় ক্রমশ নিজেকে বিকশিত করার চেষ্টা করে চলেছেন। তাঁর কবিতায় যুগযন্ত্রণা, নিষ্পেষিত নাগরিকবোধ, মানবিক মমত্ববোধ, ফেলে আসা গ্রামীণ জীবন ও সৌন্দর্যের প্রতি দুর্বলতা, ঐতিহ্য, চেতনা, কৈশোরিক পিছুটান, বয়ঃসন্ধিকাল থেকে ক্রমবিকশিত জীবনের প্রেম-বিরহ, সংঘাত, আনন্দ ও হাহাকার সর্বোপরি আত্ম উন্মোচনের অস্থিরতা মূর্ত হয়ে উঠেছে। 

‘স্বপ্নচষা কৃষক’ কবিতায় কবি লিখেছেন 

‘উত্তাল আর উন্মাদে যৌবনা নদী তুমি 

আমি অদ্ভূত স্বপ্নচষা এক কৃষক

টেনে নাও তুমি খড় কুটো বাড়ি আর ঘাটও

ভূমিহীন কৃষকের আদিগন্ত 

বিস্তৃত ফসলের স্বপ্নের মাঠও।’ 

(বুকের ভেতর পূর্ণিমা চাঁদ) 

‘মোহে নয় মুগ্ধতায় আছি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন 

‘যতবার আমি তোমায় দেখি 

ততই মুগ্ধ হয়ে যাই, কিন্তু মোহিত হইনা

জানি মুগ্ধতা একদিন কেটে যাবে 

এক জীবনে মানুষের কখনোই মোহ কাটেনা।’

(মোহে নয় মুগ্ধতায় আছি)

কবিতার পাশাপাশি জিন্নাহ চৌধুরী গল্পও লিখেন।

তার গল্প সাহিত্যে জীবনের বাস্তবতা, মানুষের অন্তর্গত অনুভূতি এবং সমাজের নানা স্তরের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে উঠে আসে। তাঁর গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। কৃত্রিমতা বা অতিরঞ্জনের পরিবর্তে তিনি জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেন।

তাঁর গল্পে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দারিদ্র্য, স্বপ্নভঙ্গ, ভালোবাসা, মানবিক সংকট এবং সমাজের নীরব বেদনা জায়গা পায়। চরিত্রগুলো কেবল গল্পের অংশ হয়ে থাকে না; তারা পাঠকের পরিচিত মানুষে রূপ নেয়। ফলে পাঠক গল্পের ভেতরে নিজের জীবন বা আশপাশের বাস্তবতাকে খুঁজে পান।

জিন্নাহ চৌধুরীর ভাষা সহজ, সাবলীল ও আবেগঘন। তিনি জটিল শব্দের আড়ালে অর্থকে লুকিয়ে রাখেন না; বরং সরল বর্ণনায় গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁর লেখায় আঞ্চলিকতা, মানবিক বোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার উপস্থিতি পাঠককে ভাবতে শেখায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group