ইমরান ইমন
ফেনীতে রীতিমতো সব প্রকার উৎসব, অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু এ মাটির সূর্যসন্তান—যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলো ছড়াচ্ছেন—তাদের নিয়ে তেমন কোনো আয়োজন-অনুষ্ঠান দেখা যায় না।
সম্প্রতি নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীনের জন্মদিন আর আজ জহির রায়হানের জন্মদিন অতিবাহিত হয়েছে। দুইজনই এ জেলার কৃতীসন্তান। কিন্তু শহরজুড়ে তাদের স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান, কোনো আয়োজন লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু নিজ জেলার বাইরে ঠিকই তাদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়—হয়েছে, এমনকি তাদের নামে চর্চার কেন্দ্রও গড়ে ওঠেছে। আর নিজ জেলায় তারা অবমূল্যায়িত। অথচ এ শহরে সংগঠনের অভাব নেই—নেই কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মীর অভাব! এ থেকে সহজেই অনুমেয় সাংস্কৃতিকভাবে দিনদিন ফেনী কোন রসাতলে যাচ্ছে!
এ শহরের অনেক কৃতীসন্তান (জীবিতদের মাঝে) এমন অবমূল্যায়নের ক্ষোভে ‘অভিমান‘ করে আর শহরের দিকে চোখ তুলে তাকাতে চান না, মাটিতে ফেলতে চান না পা। নাড়ির টানে কালেভদ্রে এলেও নিভৃতে আবার চলে যান। সাধারণ মানুষের চাইতে এসব সৃজনশীল মানুষদের অভিমান একটু বেশিই।
শহরের দিকে তাকালে শুধু খাওয়ার হোটেল-রেস্তোরাঁ আর সারি সারি চমৎকারভাবে সাজানো পোশাকের দোকান দেখা যায়। আর দেখা যায়, হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অর্থাৎ, ‘ফেনীর মানুষ খায় আর হাসপাতালে যায়‘।
এককালের ফেনী আর বর্তমানের ফেনীর মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ফেনী দেশের মধ্যে অন্যতম অগ্রসর একটি জেলা। ফেনীকে বলা হয় ‘বাজারের শহর‘, এখানকার মানুষ ‘নগদ নারায়ণে‘ বিশ্বাসী। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে ফেনী এখনও অনেক পিছিয়ে।
ফেনীর অবকাঠামোগত ঝকঝকে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু মানুষের আত্মিক উন্নয়ন নেই। এখানকার মানুষের মধ্যে টাকা হলেও ‘কালচার‘ গড়ে ওঠেনি। আর একটা জাতির মধ্যে যখন কালচার গড়ে ওঠবে না তখন তার অর্থনৈতিক মুক্তি কোনো কাজে আসবে না। ফেনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাই ফেনীর মানুষের কাছে লাইব্রেরির চেয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁ আর পোশাকের দোকানের গুরুত্ব বেশি বা বইমেলার চাইতে বাণিজ্য মেলা বা পিঠা-লতাপাতা-ফুল-পাখি-বৌ-জামাই মেলার গুরুত্ব বেশি।
এখানে অনেক কিছু রয়েছে কিন্তু কালচার নেই, নেই সাংস্কৃতিক জাগরণ। তাছাড়া এখানে দলাদলি কিংবা পারস্পরিক ঈর্ষার মাত্রাটা বেশি। কেউ কাউকে সাইড দিতে চায় না, অযোগ্যদের দৌরাত্ম্য বেশি, গুণীদের কদর নেই বললেই চলে। গুণীদের অনেক ক্ষেত্রে কোণঠাসা করে রাখা হয়।
এখানে একটি সরকারি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি রয়েছে। লাইব্রেরিতে একদিন অনুসন্ধান করতে গিয়ে দুর্লভ কিছু বই আবিষ্কার করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, লাইব্রেরিটি যে জায়গায় রয়েছে সেখানে পাঠক যেতে পারেন না। অর্থাৎ, সেটি ওভাবে কাজে আসছে না।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাংস্কৃতিকচর্চার জন্য ‘জহির রায়হান হল‘ ছিল কিন্তু সেটি এখন আর নেই। নতুন করে নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে যে সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল এরপর থেকে আশ্বাস আর এখন অবধি আলোর মুখ দেখেনি। জহির রায়হান হল নির্মাণ না হলেও সেখানে বড় অংকের চাঁদার বিনিময়ে কিন্তু হরেক রকমের মেলা বসতো, বসে।
কেন বারবার জহির রায়হান হল নির্মানের কথা বলেও নির্মাণ করা হয়নি, তা নিয়ে এখন সোচ্চার হতে হবে। শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ‘দালাল ও দুর্বৃত্তমুক্ত‘ করতে হবে।
ফেনীর বর্তমান প্রজন্ম জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ফেনীর কৃতীসন্তানদের নাম জানে না, তাদের গৌরবগাঁথা সম্পর্কে তারা অবগত নয়। কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে জেলার শ্রেষ্ঠ এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলাম, ফেনীর দুইজন বুদ্ধিজীবীর নাম বলতে। তারা বলতে পারলো না। এমন প্রজন্ম দিয়ে আমাদের কী হবে? আর এর দায়ভার কে নেবে?
অথচ এককালের ফেনী বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে ছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। এখান থেকে দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আলো ছড়াচ্ছেন স্যার এএফ রহমান, হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, খাজা আহমদ, জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন, ভাষাশহীদ আব্দুস সালাম, শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন, শামসুন নাহার, শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আনম ফজলুল হক মহী, শহীদ ডা. ক্যাপ্টেন বদিউল আলম চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসা, সাংবাদিক আবদুস সালাম, গিয়াস কামাল চৌধুরী, ওবায়েদ উল হক, কবি বেলাল চৌধুরী প্রমুখের মতো আলোকিত মানুষরা।
আমাদের আবার সমৃদ্ধির পথে যেতে হলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা জরুরি। ‘গুণীজনদের সম্মান জানালে আরও গুণী সৃষ্টির পথ তৈরি হয়‘—এ বোধ এ শহরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে। কালচার সংকটে জর্জরিত শহরটিতে আবার সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে হবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ফেনী আমার আপনার আমাদের সবার।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |