জুবাইর আল মুজাহিদ
ঘুষের বিনিময়ে নিশ্চিত সরকারি চাকরির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এক সৎ শিক্ষক বাবা। বাবার সেই আদর্শকে ধারণ করে সংগ্রাম, ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসে সফলতার জায়গা তৈরি করেছেন ফেনীর তরুণ মো. বরকত উল্যাহ মাসুদ। শুধু নিজের অবস্থান গড়েই থেমে থাকেননি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন আরও ৮ থেকে ১০ জন তরুণের।
ফেনী সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ছনুয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. বরকত উল্যাহ মাসুদ। তার পিতা সেলিম উল্যাহ একজন সৎ স্কুল শিক্ষক এবং মাতা হাছিনা আক্তার। তিনি ছনুয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ফেনীর জয়নাল হাজারী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।
মাসুদ জানান, ২০১৪ সালে কলেজ জীবন শেষে চট্টগ্রাম মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। ভাইভাও ভালো হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। সৎ শিক্ষক বাবা সেলিম উল্যাহ ঘুষের মাধ্যমে ছেলেকে ভর্তি করাতে রাজি হননি। ফলে মেরিটাইমে ভর্তি হওয়া হয়নি তার।
এদিকে মেরিটাইমে ভর্তির প্রস্তুতির কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আবেদন করা হয়নি। পরে সময় নষ্ট না করে পরিবার তাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় কম্পিউটার সম্পর্কে তার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। সহপাঠীদের অনেকেই শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রযুক্তিতে এগিয়ে ছিল। প্রথমদিকে বন্ধুদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে কাজ শেখা শুরু করেন তিনি। পরে বাবার সহযোগিতায় একটি ল্যাপটপ কিনে দিলে ধীরে ধীরে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে।
ফেসবুকে অনলাইন আয়ের একটি বিজ্ঞাপন দেখে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায় মাসুদের। এরপর গুগল ও ইউটিউব ঘেঁটে শেখা শুরু করেন। প্রথমদিকে কিছু ভুয়া সাইটে কাজ করে প্রতারিতও হন। পরে অনলাইন ইনকাম সম্পর্কিত একটি টিউটোরিয়াল সিডি থেকে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নতুনভাবে শেখা শুরু করেন।
প্রথমে ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট শিখলেও পরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়েন তিনি। ২০১৭ সালে ফাইবারে প্রথম অ্যাকাউন্ট খুলে কাজ শুরু করেন। কিছু কাজ পেলেও পরে অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড হয়ে যায়। ২০১৮ সালেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। তবে হাল ছাড়েননি মাসুদ। বরং ফাইবারের নিয়মকানুন ও মার্কেটপ্লেস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং নিজের দক্ষতা ও পোর্টফোলিও আরও উন্নত করেন।
অবশেষে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুনভাবে ফাইবার অ্যাকাউন্ট খোলার ২৬ দিনের মাথায় প্রথম ১০ ডলারের কাজ পান। এরপর নিয়মিত কাজ আসতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সফলতার মুখ দেখেন তিনি।
বর্তমানে তিনি আপওয়ার্ক ও ফাইবারে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া পিপল পার আওয়ারে লেভেল-৫ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ডটকম, গুরু ডটকম ও বিভিন্ন লোকাল ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে ১০০টিরও বেশি বড় প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছেন তিনি। দেশের বাইরের প্রায় ৩০ জন নিয়মিত ক্লায়েন্টের সঙ্গেও কাজ করছেন।
মাসুদ জানান, বর্তমানে তার মাসিক গড় আয় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি।
তিনি বলেন, “গতানুগতিক চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরও কয়েকজনের আয়ের ব্যবস্থা করতে পেরে ভালো লাগে। ভবিষ্যতে নিজের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে।”
দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এখনো সমাজের অনেক মানুষ ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে গুরুত্ব দেয় না। এছাড়া নিজস্ব পেমেন্ট গেটওয়ে না থাকায় অতিরিক্ত ভ্যাটসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় রাত জেগেও কাজ করতে হয়।
তবে তিনি মনে করেন, ডিজিটাল যুগে ফ্রিল্যান্সিং হবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পেশাগুলোর একটি। সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রিল্যান্সিংকে স্বীকৃতি এবং ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড প্রদানের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
নতুনদের উদ্দেশ্যে মাসুদের পরামর্শ, “যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বেসিক ইংরেজি জানতে হবে। ধৈর্য, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় ছাড়া এই খাতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। কোনো অবস্থাতেই হতাশ হওয়া যাবে না।”
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |