কিশান মোশাররফ:
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের বহু কলেজে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে; অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।
প্রশ্ন হলো-এই দায় কার? শিক্ষার্থীর, অভিভাবকের, শিক্ষকের, নাকি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের? বাস্তবতা হলো, দায় একক কারও নয়; বরং এটি একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতার ফল।
প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত সনদনির্ভর। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যক্তিত্ব গঠন হলেও বাস্তবে তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পরীক্ষার নম্বর ও সনদ অর্জনের মধ্যে। ফলে যে শিক্ষার্থী মনে করে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারবে না, সে অনেক সময় পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করে না। আবার কেউ কেউ দীর্ঘ সময় কলেজে না গিয়েও কোচিং কিংবা ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, গেমিং এবং অনলাইন বিনোদন তরুণদের সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। অনেক শিক্ষার্থী রাতভর মোবাইল ব্যবহারের কারণে সকালে ক্লাসে যেতে পারে না, নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগ হারায় এবং ধীরে ধীরে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, আড্ডাবাজি ও উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানোর সংস্কৃতিও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর কিংবা মফস্বলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না গিয়ে চায়ের দোকান, বাজার বা বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সময় আড্ডা দিচ্ছে। এর পেছনে কেবল ব্যক্তিগত দায় নয়, বরং একটি সামাজিক বাস্তবতাও কাজ করছে। তরুণদের জন্য ইতিবাচক সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তারা বিকল্পহীনভাবে সময় নষ্টের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে মাদকের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়া। ইয়াবা, গাঁজা, মাদকজাত দ্রব্য কিংবা নেশাসংক্রান্ত অন্যান্য উপকরণের সহজলভ্যতা অনেক তরুণকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। নেশা কেবল শারীরিক ক্ষতি করে না; এটি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও ধ্বংস করে দেয়। যে তরুণ একসময় স্বপ্ন দেখত, সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব বেড়েছে। অর্থনৈতিক ব্যস্ততা, পারিবারিক চাপ কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের দৈনন্দিন শিক্ষা ও মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখতে পারছেন না। ফলে সন্তান কখন ক্লাসে যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিনা-এসব বিষয়ে যথাযথ নজরদারি অনুপস্থিত থাকে।
শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান এখনো একঘেয়ে, মুখস্থনির্ভর এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষ যদি আকর্ষণীয় না হয়, পাঠদান যদি অনুপ্রেরণাদায়ক না হয়, তবে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ হারাবে। আধুনিক প্রযুক্তি, অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক পাঠদানের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখ করে তুলছে।
অন্যদিকে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাও শিক্ষাবিমুখতার অন্যতম কারণ। একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই, তখন তার মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। বহু শিক্ষিত বেকারের বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। তারা প্রশ্ন তোলে-এত পড়াশোনা করে লাভ কী? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র ও সমাজকে দিতে হবে।
এখানেই কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে সাধারণ শিক্ষা মর্যাদাপূর্ণ, আর কারিগরি শিক্ষা দ্বিতীয় শ্রেণির। বাস্তবে বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় কারিগরি শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার। সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে কেউ যদি তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, মেশিন অপারেশন কিংবা অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে, তাহলে তা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র-উভয়ের জন্য লাভজনক হবে।
তবে কারিগরি শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে সফলতার একমাত্র পথ চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা প্রশাসক হওয়া নয়। একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা কিংবা কারিগরি বিশেষজ্ঞও সম্মানজনক ও সমৃদ্ধ জীবন গড়ে তুলতে পারেন। রাষ্ট্রকেও কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাকেও যুগোপযোগী করতে হবে। পাঠ্যক্রমে জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং কর্মমুখী জ্ঞানের সমন্বয় জরুরি। শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নিয়মের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন।
আজকের তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তারা যে সমাজ, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠছে, সেই কাঠামোর দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ অনুপস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
অতএব, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমুখতার কারণ অনুসন্ধান করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মোবাইল ও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা, মাদক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, শিক্ষাকে কর্মমুখী করা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো-এসবই হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ভিত্তি।
শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের উপায় নয়; এটি একটি জাতির আত্মার নির্মাণপ্রক্রিয়া। সেই নির্মাণপ্রক্রিয়া যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের সকল দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাই এখনই সময়, শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং বাস্তবমুখী, দক্ষতানির্ভর ও মানবিক শিক্ষার পথে অগ্রসর হওয়ার।
লেখক : চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |