| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব ডিজিটাল শিক্ষার নতুন অভিযাত্রা

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 28-09-2026 ইং
  • 17 বার পঠিত
ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব  ডিজিটাল শিক্ষার নতুন অভিযাত্রা
ছবির ক্যাপশন: ফরিদুল ইসলাম


ফরিদুল ইসলাম

একটি সময় ছিল, যখন শিক্ষকের প্রধান শিক্ষাসঙ্গী ছিল পাঠ্যবই, খাতা, কলম ও ব্ল্যাকবোর্ড। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র বদলেছে। আজকের বিশ্বে জ্ঞান প্রতিনিয়ত নবায়িত হচ্ছে, প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে যোগাযোগের ধরন, কর্মক্ষেত্রের চাহিদা এবং শিক্ষার পদ্ধতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন প্রশিক্ষণ, ভার্চুয়াল সহযোগিতা এবং তথ্যভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পনা নয়; এগুলো বর্তমান বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় “ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” উদ্যোগ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ‘ঙহব ঞবধপযবৎ, ঙহব ঞধন’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রেও একটি বিস্তৃত আইটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ‘ঙহব ঞবধপযবৎ, ঙহব ঞধনষবঃ’ মডেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠদানের মানোন্নয়ন, শিখন-ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে সহায়তা করা। তবে প্রশ্ন হলো—প্রতিটি শিক্ষকের হাতে একটি ট্যাব তুলে দিলেই কি ডিজিটাল শিক্ষার রূপান্তর ঘটবে? উত্তর হলো, না। একটি ট্যাব কেবল একটি যন্ত্র। কিন্তু দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং সঠিক নীতিগত পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হলে এই যন্ত্রই হয়ে উঠতে পারে শিক্ষার নতুন যুগের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—প্রযুক্তিই পরিবর্তন ঘটাবে। বাস্তবে পরিবর্তন ঘটান শিক্ষক। প্রযুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর ওঈঞ ঈড়সঢ়বঃবহপু ঋৎধসবড়িৎশ ভড়ৎ ঞবধপযবৎং শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতাকে শিক্ষা নীতি, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা শুধু ডিভাইস চালাতে পারার দক্ষতা নয়; বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে পাঠদান, মূল্যায়ন, পরিকল্পনা এবং পেশাগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি ট্যাব ব্যবহার করে শুধু ফাইল দেখা বা প্রশাসনিক তথ্য পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তাহলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগবে না। কিন্তু একই শিক্ষক যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠ পরিকল্পনা উন্নত করেন, শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন, নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি শেখেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষাসামগ্রী বিনিময় করেন, তাহলে একটি ট্যাব সত্যিকার অর্থেই তাঁর পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তাই ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাবের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—“প্রত্যেক শিক্ষককে একটি ডিভাইস দেওয়া নয়; প্রত্যেক শিক্ষককে ডিজিটালভাবে সক্ষম করে তোলা।”

একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী একইভাবে শেখে না। কেউ পড়ে ভালো শেখে, কেউ শুনে, কেউ দেখে এবং কেউ হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে দ্রুত বুঝতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এই বৈচিত্র্যময় শিখন-পদ্ধতিকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। একজন শিক্ষক ট্যাব ব্যবহার করে— ছবি ও চিত্রের মাধ্যমে জটিল বিষয় সহজ করতে পারেন; শিক্ষামূলক ভিডিও ও অ্যানিমেশন ব্যবহার করতে পারেন; ডিজিটাল মানচিত্র ও ভিজ্যুয়াল উপকরণ ব্যবহার করতে পারেন; অডিওর মাধ্যমে ভাষা ও উচ্চারণ শিক্ষা সহায়তা করতে পারেন; ইন্টারঅ্যাকটিভ উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারেন; প্রয়োজন অনুযায়ী অফলাইন ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারেন। ইউনেস্কোর গবেষণা বলছে, প্রযুক্তি শিক্ষাদান ও শেখার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর ফলাফল নির্ভর করে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। প্রযুক্তি সঠিক শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হলে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ও শেখার সুযোগ বাড়তে পারে; কিন্তু শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায় না। এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি শ্রেণিকক্ষে থাকবে, কিন্তু পাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে শিক্ষকের হাতে এবং শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আজ একটি বড় সম্ভাবনা হলো নতুন প্রজন্মের শিক্ষক। তাঁরা প্রযুক্তি ব্যবহার, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত। এই তরুণ শক্তিকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সুযোগ দেওয়া গেলে তাঁরা শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারেন। তবে ডিজিটাল শিক্ষা শুধু তরুণ শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষকদের রয়েছে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং কার্যকর পাঠদানের মূল্যবান অভিজ্ঞতা। তাই প্রয়োজন দুই শক্তির সমন্বয়—তারুণ্যের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা + অভিজ্ঞ শিক্ষকের পেশাগত প্রজ্ঞা = শক্তিশালী ডিজিটাল শিক্ষা। একটি কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে প্রযুক্তিতে দক্ষ শিক্ষকরা অন্য শিক্ষকদের সহায়তা করতে পারেন। বিদ্যালয় বা ক্লাস্টারভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি।

শিক্ষকের শেখা কখনো শেষ হয় না। নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, নতুন গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে একজন শিক্ষককে নিয়মিত পরিচিত হতে হয়। একটি ট্যাব শিক্ষকের জন্য হতে পারে ব্যক্তিগত ডিজিটাল শেখার কেন্দ্র। এর মাধ্যমে শিক্ষক—অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারবেন; নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারবেন; পাঠ পরিকল্পনা তৈরি ও সংরক্ষণ করতে পারবেন; ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবেন; সহকর্মীদের সঙ্গে উপকরণ ভাগাভাগি করতে পারবেন; পেশাগত নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন; নিজের দক্ষতা নিয়মিত উন্নত করতে পারবেন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক ডিজিটাল শিক্ষা কৌশল শিক্ষককে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রূপান্তরের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। সংস্থাটি বিশেষভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত ডিভাইসে নয়, ডিভাইস ব্যবহারে সক্ষম মানুষের দক্ষতায়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শেখে না। একই শ্রেণিতে কেউ দ্রুত শিখছে, কেউ পিছিয়ে পড়ছে, আবার কেউ মৌলিক দক্ষতায় অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন করছে। প্রযুক্তি শিক্ষককে শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। নিয়মিত মূল্যায়নের তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষক বুঝতে পারেন— কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে পিছিয়ে আছে; কোন দক্ষতায় বেশি সমস্যা হচ্ছে; কোন শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন; কোন পাঠ বা পদ্ধতি বেশি কার্যকর হচ্ছে। তবে এখানে সতর্কতা জরুরি। তথ্য সংগ্রহ যেন শিক্ষকের ওপর নতুন প্রশাসনিক বোঝা তৈরি না করে। প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত—“তথ্য সংগ্রহে শিক্ষককে ব্যস্ত রাখা নয়, তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষককে আরও কার্যকর করা।”

ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো ডিজিটাল বৈষম্য।

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমান ইন্টারনেট সুবিধা নেই। সব এলাকায় বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও একরকম নয়। শহর ও গ্রামের প্রযুক্তিগত সুযোগের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে শিশুদের দূরশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকার শিশুদের দূরশিক্ষণে অংশগ্রহণ শহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও অন্যান্য স্তরের তুলনায় কম ছিল। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না; ডিভাইস, সংযোগ এবং ব্যবহার সক্ষমতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে—১. দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার বিদ্যালয়কে; ২. দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের বিকল্প হিসেবে অফলাইন কনটেন্টকে; ৩. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধাকে; ৪. ডিভাইস রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে; ৫. প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা শিক্ষকদের সহায়তাকে।

একটি ট্যাব বিতরণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেটিকে কার্যকরভাবে শিক্ষার কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা অনেক বেশি জটিল। সফল বাস্তবায়নের জন্য অন্তত পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত: প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ একবারের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শেষ করলে হবে না। শিক্ষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত: মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট ট্যাবে যদি পাঠ্যক্রমভিত্তিক ও সহজে ব্যবহারযোগ্য কনটেন্ট না থাকে, তাহলে ডিভাইসের ব্যবহার সীমিত হয়ে যাবে। তাই শ্রেণি ও বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত বাংলা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি জরুরি। তৃতীয়ত: ইন্টারনেটের পাশাপাশি অফলাইন সুবিধা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমান গতির ইন্টারনেট থাকবে—এমন বাস্তবতা এখনও নেই। তাই অফলাইনেও গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট ব্যবহার করা সম্ভব হতে হবে। চতুর্থত: কারিগরি সহায়তা ডিভাইস নষ্ট হলে শিক্ষক কোথায় যাবেন? সফটওয়্যার সমস্যার সমাধান কে করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আগেই নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চমত: তথ্য নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তথ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষকের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ শিক্ষার্থীরা এখন সহজেই ইন্টারনেট থেকে বিপুল তথ্য পেতে পারে। কিন্তু কোন তথ্য সঠিক, কোনটি ভুল, কোনটি পক্ষপাতদুষ্ট—তা যাচাই করার দক্ষতা তৈরি করা শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এআই বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষককে সহায়তা করতে পারে—যেমন পাঠ পরিকল্পনার ধারণা তৈরি, ভাষাগত সহায়তা, শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতির প্রাথমিক খসড়া এবং শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু উপকরণ সাজাতে। কিন্তু এআইয়ের তৈরি তথ্যকে যাচাই ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী হলেই চলবে না; তাঁকে হতে হবে—তথ্য যাচাইয়ে দক্ষ; ডিজিটাল নৈতিকতায় সচেতন; শিক্ষার্থীর তথ্য সুরক্ষায় দায়িত্বশীল; এআই ব্যবহারে বিচক্ষণ; প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। ট্যাব তাই ভবিষ্যতে শুধু ডিজিটাল কনটেন্ট দেখার যন্ত্র নয়; এটি হতে পারে প্রযুক্তিসচেতন ও দায়িত্বশীল শিক্ষক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টে প্রযুক্তির শিক্ষা-প্রভাবকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। প্রযুক্তির ফলাফল নির্ভর করে শিক্ষকের প্রস্তুতি, অবকাঠামো, শিক্ষণ-পদ্ধতি, কনটেন্টের মান এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত প্রযুক্তি বিনিয়োগে ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—প্রথমে প্রয়োজন নির্ধারণ, তারপর উপযুক্ত প্রযুক্তি নির্বাচন এবং শেষে ফলাফল মূল্যায়ন।

ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচির সঙ্গে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে থাকতে পারে—শ্রেণিভিত্তিক পাঠ পরিকল্পনা; পাঠ্যক্রমভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট; শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডিউল; ভিডিও ও অডিও শিক্ষাসামগ্রী; মূল্যায়ন সহায়ক উপকরণ; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপকরণ; শিক্ষকদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ভাগাভাগির সুযোগ। এর ফলে দেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষক যদি কার্যকর কোনো শিক্ষণ-পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, সেটি দেশের অন্য প্রান্তের শিক্ষকও ব্যবহার করতে পারবেন। এভাবেই তৈরি হতে পারে একটি জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষক কমিউনিটি।

ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচিকে সফল করতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—

১. প্রতিটি ট্যাব শিক্ষকের পেশাগত ব্যবহারের উপযোগী করে প্রস্তুত করা। ২. বাংলা ভাষাভিত্তিক পাঠ্যক্রম-সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কনটেন্ট প্রি-লোড করা। ৩. প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনের জন্য ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া। ৪. উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত কারিগরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ৫. দুর্বল ইন্টারনেট এলাকার জন্য অফলাইন কনটেন্ট নিশ্চিত করা। ৬. ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি না করা। ৭. শিক্ষককে শুধু ব্যবহারকারী নয়, কনটেন্ট নির্মাতা ও উদ্ভাবক হিসেবেও উৎসাহিত করা। ৮. বাস্তবায়নের আগে ও পরে শিখনফল, শিক্ষক সক্ষমতা এবং ব্যবহার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা। ৯. সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা। ১০. অভিজ্ঞ ও তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে ডিজিটাল মেন্টরশিপ ব্যবস্থা চালু করা।

একটি ট্যাব হাতে তুলে দেওয়া সহজ। কিন্তু সেই ট্যাবকে শিক্ষকের দক্ষতা, শিক্ষার্থীর শিখন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা—সেটিই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। আজকের পৃথিবীতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সুযোগ নেই। আবার প্রযুক্তিকেই শিক্ষার একমাত্র সমাধান ভাবাও সঠিক নয়। প্রয়োজন মানুষের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিয়ে সেই মানুষকে প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করা। ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব হতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে শিক্ষকের হাতে, উদ্ভাবনের শক্তি থাকবে তারুণ্যের মধ্যে এবং শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “এক শিক্ষক, এক ট্যাব” নয়; বরং—একজন দক্ষ শিক্ষক, একদল কৌতূহলী শিক্ষার্থী এবং একটি প্রযুক্তিসক্ষম ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। প্রযুক্তি হবে সহায়ক, শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক এবং শিক্ষার্থী হবে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান শক্তি।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক।


নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group