| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

শর্শদীতে প্রবাসীর স্ত্রী রিনা হত্যাকাণ্ড মাদকের টাকা জোগাড় করতেই খুন করা হয় প্রবাসীর স্ত্রী রিনাকে

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 17-05-2026 ইং
  • 314 বার পঠিত
শর্শদীতে প্রবাসীর স্ত্রী রিনা হত্যাকাণ্ড মাদকের টাকা জোগাড় করতেই খুন করা হয় প্রবাসীর স্ত্রী রিনাকে
ছবির ক্যাপশন: শর্শদীতে প্রবাসীর স্ত্রী রিনা হত্যাকাণ্ড মাদকের টাকা জোগাড় করতেই খুন করা হয় প্রবাসীর স্ত্রী রিনাকে

জুবাইর আল মুজাহিদ

ফেনী সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নে সৌদি প্রবাসী মোহাম্মদ মানিকের নির্মাণাধীন ভবন থেকে তার স্ত্রী রিনা আক্তারের বালুচাপা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন রাজমিস্ত্রির সহকারী সাইফুল ইসলাম (২৯) কে গ্রেপ্তারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পরও এলাকায় বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। 

গত শুক্রবার সাইফুল ইসলামের বাড়ির সামনে স্থানীয়রা বিক্ষোভ করে মাদকরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানানো হয়েছে। আজ রবিবারও বিকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মোহাম্মদ আলী বাজারে ছাত্র সমাজ ও সর্বস্তরের জনগনের ব্যানারে প্রতিবাদ কর্মসূচীর অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবাদের সকল ক্ষেত্রেই কিস্তি নয়; বরং মাদকের বিষয়টিই বারবার আলোচনায় উঠে আসছে।  

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে গতকাল শনিবার দিনভর দৈনিক স্টার লাইন পত্রিকার একটি টিম এলাকাঘুরে সাধারণ মানুষ, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের স্বজনদের সাথে কথা বলে। প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে ঘটনা বিশ্লেষনের চেষ্টা করে। এতে উঠে আসে কিস্তির টাকার জন্য গৃহবধু রিনা আক্তারকে খুন করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে মাদকের টাকা জোগাড় করতেই খুন করা হয়েছে বলে দাবী তুলেছেন ভুক্তভোগী নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী। তাদের দাবী কিস্তির কথা বলে আদালত এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছে একটি চক্র। ওই চক্র মাদককারবারীদের বিষয়ে নিশ্চুপ রাখতে চায় এলাকাবাসীকে।  

গ্রেপ্তার সাইফুল আদালতে দাবি করেছেন, একটি এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। টাকার প্রয়োজনেই রিনা আক্তারের কানের দুল ছিনিয়ে নেন। পরে সেই দুল ১৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান। জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই টাকার একটি অংশ দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা সেবনও করেন তিনি।

তবে অনুসন্ধানে সাইফুলের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে কোনো এনজিও ঋণ বা কিস্তির নথিপত্র অথবা প্রমাণপত্র পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরাও স্পষ্টভাবে কোনো কিস্তির তথ্য দেখাতে পারেননি। এতে ‘ঋণের চাপে খুন’ এই দাবি নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে সাইফুল একজন চিহ্নিত মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে মাদকসেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা বিভিন্ন আলামত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় ভবনটি নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডাখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

এদিকে আদালতে সাইফুল একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেও রীনা আক্তারের পরিবার ও স্থানীয়দের ভিন্ন মত রয়েছে। স্থানীয়রা বলছে, হত্যার দিন নির্মাণাধীন ভবনে একাধিক বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল। তাই শুধু একজনের পক্ষে হত্যা করে মরদেহ বালুচাপা দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। এঘটনায় আরও ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। 


প্রতি সন্ধ্যায় রিনার বাড়িতে বসত মাদকের আড্ডা

দৈনিক স্টার লাইন পত্রিকার অনুসন্ধান টিমের কাছে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রবাসী মানিকের বাড়িটি তুলনামূলক নির্জন এলাকায়। একজমি পর একটি ঘর থাকলেও তারা সন্ধার পর ঘর থেকে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বের হন না। এ সুযোগে নির্মানাধিন ওই ঘরটি মাদক সেবন ও মাদক বিক্রির জন্য পছন্দ করে মাদক কারবারীরা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রেপ্তারকৃত সাইফুলসহ আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের আনাগোনা থাকতো নির্মাণাধিন ওই বাড়িতে। কিন্তুু মাদক কারবারীরা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হয়রানীর ভয় থাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি।    

খুন হওয়া রিনার স্বজনরা জানান, কিছুদিন আগে রিনা কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রামে যান। সেখান থেকে এসে দেখেন তার নির্মাণাধিন বাড়িতে মাদক কারবারী ও মাদক সেবনকারীরা বিভিন্ন কক্ষে পায়খানা করে চলে গেছে। পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে রাজমিস্ত্রি হেলপার সাইফুলসহ অন্যান্যদের গালিগালাজ করেন। এতে মাদককারবারীরা গৃহবধুর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ওই ক্ষোভ থেকেই মাদক কারবারীরা এ জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারেন। 


মাদকাসক্ত, তাই খুনি সাইফুলকে সিএনজি চালাতে দিত না কেউ

স্থানীয়দের কাছে সাইফুল নামটি মাদক কারবারী ও মাদকসেবী নামের পরিচিত। এক সময়ে সাইফুল সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও সম্প্রতি সে মাদকে ডুবে যায়। মাদকাসক্ত অবস্থায় সিএনজি চালিয়ে দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে বলে স্থানীয় সিএনজি মালিকরা তাকে সিএনজি চালাতে দিতো না। 

স্থানীয় ব্যবসায়ী সরোয়ার ভুঞা বলেন, সাইফুল ইসলাম এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত। একসময় সে সিএনজি চালালেও মাদক সংশ্লিষ্টতার কারণে নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় এলাকার কেউ তাকে আর সিএনজি চালানোর জন্য দিত না।

তিনি আরো বলেন, “এ হত্যাকাণ্ডের পর আমরা শুক্রবার জুমার নামাজের পর সামাজিকভাবে বসেছি। এলাকায় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যারা মাদকসেবন করবে, বিক্রি-ক্রয় করবে, তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করবো এবং আইনের হাতে তুলে দিবো।” আমাদের সমাজ ও এলাকায় মাদকের বিষয়ে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না। মাদক আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অপরাধ বেড়েছে। রীনা আক্তার খুনের পেছনেও মাদকাসক্তের বিষয় জড়িয়ে আছে।  


সাইফুলের কিস্তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না তার মা

দৈনিক স্টার লাইন পত্রিকার অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা গতকাল দুপুরের দিকে খুনের অভিযোগে জেল হাজতে থাকা সাইফুল ইসলামের ঘরে গিয়ে তার কাছে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংকের পাওনা নিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। এসময় ঘর থেকে ষাটোর্ধ একজন নারী আমাদের টিমের সাথে কথা বলেন, তিনি বলেন আমি সাইফুলের মা। সাইফুল কোন কোন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে আমরা তা জানিনা। সাইফুলের ঋণ সম্পর্কে আমাদের কাছে তেমন কোন তথ্য নেই। অনুসন্ধানী টিমের সদস্যরা বারবার নানা চেষ্টা করেও সাইফুলের আলোচিত ‘ঋণের কিস্তি’র বিষয়ে কোন তথ্য বা প্রমাণ বের করতে পারেনি। তবে সাইফুলের প্রতিবেশিরাও দাবী করেছে ‘সাইফুল ঋণের টাকার জন্য নয়; সে মূলত নেশা করার জন্য টাকা জোগাড় করতেই রিনাকে মেরে ফেলেছে।’   


হত্যার ঘটনা নিয়ে যা বলছেন স্বজন ও স্থানীয়রা

রিনা হত্যা কান্ডটিকে শুধুমাত্র কিস্তির টাকা জন্য বলে প্রচার করা হলেও বিষয়টি মানতে নারাজ ভুক্তভোগী ও এলাকার জনসাধারণ। তাদের মতে, মাদকসেবীরা রিনার নির্মাণাধিন বাড়িতে মাদক সেবন করে ওই ঘরের বিভিন্ন কক্ষে পায়খানা করে রাখতো। রড সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রী লুটে নিয়ে যেতো। তাই রিনা আক্তার প্রায়ই তাদেরকে গালিগালাজ করতেন। ওই ক্ষোভ থেকেই রিনাকে হত্যা করা হয়েছে। 

রিনা আক্তারের পরিবারের সদস্যদের দাবি, এটি শুধুমাত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। তারা মনে করছেন, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত এবং এর পেছনে আরও একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্য মাদক কারবারীদের নামও তুলে আনার দাবী স্বজনদের। 

নিহতের ননদ মরিয়ম আক্তার পারভীন জানান, এর আগেও ওই নির্মাণাধীন ভবন থেকে নেশাকারীরা রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী চুরি করেছিলো। তিনি বলেন, “আমার ভাবীর কান থেকে নেওয়া একজোড়া কানের দুল উদ্ধারের কথা বলা হলেও তার স্বর্ণের পরিমাণ আরও বেশি ছিল। দুই কানে জোড়া দুল ছিল। এছাড়াও নাকফুলসহ আরও গয়না ছিল। অথচ পুলিশ শুধু এক জোড়া কানের দুল উদ্ধারের কথা বলছে। বাকী স্বর্ণগুলো কোথায় গেল; সে বিষয়েও সাইফুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে খুনের সাথে সম্পৃক্ত অন্যদের নামও উঠে আসবে”। তিনি আরও অভিযোগ করেন, হত্যার পর স্বর্ণের প্রকৃত হিসাব সামনে আসেনি এবং পরিবারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া আলামতের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

রিনা আক্তারের মেয়ে আয়েশা আক্তার বলেন,

“আমার মাকে শুধু কিস্তির টাকার জন্য হত্যা করা হয়নি। তারা এলাকার চিহ্নিত মাদকসেবী ছিল। আমাদের নির্মাণাধীন ঘরে মাদক সেবন করতো, নোংরা করতো। মা এসবের প্রতিবাদ করতেন। সাইফুলের সাথে আরো কিছু লোক সেখানে যাতায়াত করতো। তারা মাদকের টাকার জন্য আমার মাকে হত্যা করেছে। আমরা এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও ফাঁসি চাই।” তিনি দাবি করেন, তার মা বারবার ওই ভবনে মাদকসেবীদের যাতায়াত বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

নিহত রিনা আক্তারের বোন হালিমা আক্তার বলেন,

 “আমার বোন দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় বসবাস করছে। মাদকাসক্তরা তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছে। আমরা তাদের ফাঁসি চাই। সাইফুলসহ যারা এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক। সাইফুল একা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ভবনটি দীর্ঘদিন নজরদারির বাইরে থাকায় সেটি অপরাধীদের নিরাপদ জায়গায় পরিণত হয়েছিল। তারা এ ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group