| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ‘মাগা’ রাজনীতি এক অনিশ্চিত বিশ্বের প্রেক্ষাপট

রিপোর্টারের নামঃ Reporter
  • আপডেট টাইম : 08-04-2026 ইং
  • 2502 বার পঠিত
যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ‘মাগা’ রাজনীতি   এক অনিশ্চিত বিশ্বের প্রেক্ষাপট
ছবির ক্যাপশন: যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ‘মাগা’ রাজনীতি এক অনিশ্চিত বিশ্বের প্রেক্ষাপট


শামীম পাটোয়ারী:

বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো ক্রমেই আরও আগ্রাসী, আরও একমুখী এবং আরও সংঘাতনির্ভর হয়ে উঠছে। ইরানের উপর সম্ভাব্য হামলার আলোচনা, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট অপহরণের অভিযোগ, গ্রীনল্যান্ড দখলের হুমকি কিংবা কিউবা ও উত্তর কোরিয়াকে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা-এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক নকশার অংশ। এই নকশা কোনো একক ব্যক্তির নয়, এমনকি শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প-এরও নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের ধারাবাহিক রূপ, যার কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক আধিপত্য, বাজার দখল এবং সামরিক শক্তির সম্প্রসারণ।

ÒMake America Great Again”-সংক্ষেপেMAGA-শুধু একটি নির্বাচনী স্লোগান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, একটি আদর্শিক নির্মাণ। এর মাধ্যমে মার্কিন জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং এক ধরনের ভীতিনির্ভর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে-আমেরিকা কি সত্যিই ‘আবার মহান’ হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে? ইতিহাস বলছে, এই ‘মহানতা’র ধারণা মূলত ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত।

বিশেষত ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ভারসাম্য ছিল। ভøাদিমির লেনিন-এর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মার্কিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্বই ছিল সেই ভারসাম্যের মূল। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ভেঙে পড়ার পর আমেরিকার সামনে আর তেমন কোনো কার্যকর চ্যালেঞ্জ রইল না। ফলে ‘মহানতা’র এই ধারণা নতুন করে উত্থাপিত হয়-যেখানে প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতিতে নিজস্ব শক্তির প্রদর্শনই হয়ে ওঠে রাজনীতির মূল ভিত্তি।

এই ধারার সূচনা আরও আগে, ১৯৮০-এর দশকে রোনাল্ড রিগ্যান-এর সময়েই দেখা যায়। অর্থনৈতিক মন্দা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষত এবং অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি জাতীয়তাবাদী আবেগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ট্রাম্প সেই ধারাকেই আরও তীব্র, আরও আক্রমণাত্মক রূপে পুনরুজ্জীবিত করেন।

গঅএঅ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-কল্পিত শত্রু নির্মাণ। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, কখনো ‘কমিউনিস্ট হুমকি’, কখনো ‘সন্ত্রাসবাদ’, আবার কখনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা নেতাকে বৈশ্বিক শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। September 11 attacks-এর পর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এই কৌশলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই প্রেক্ষাপটে ওসামা বিন লাদেন, সাদ্দাম হোসেন কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি-এর মতো ব্যক্তিদের বৈশ্বিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই শত্রু নির্মাণের পেছনে একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে-যুদ্ধের ন্যায্যতা তৈরি করা। কারণ আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রমও। ‘সামরিক অর্থনীতি’ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা, যেখানে যুদ্ধ নিজেই একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে Lockheed Martin, RTX Corporation, Boeing, General Dynamics Ges Northrop Grumman-এর মতো বৃহৎ করপোরেশন, যাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিবদ্ধ চবহঃধমড়হ।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট বিশ্বে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ৯০১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ। এই বিপুল ব্যয়ের যৌক্তিকতা হিসেবে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে এর একটি বড় অংশ অস্ত্রশিল্প ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য লক্ষণীয়-একদিকে বিপুল সামরিক ব্যয়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট। বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, শিক্ষা ব্যয়ের চাপ এবং ঋণের বোঝা-এসব সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মার্কিন নাগরিক। অথচ গবেষণা বলছে, প্রতি ১ মিলিয়ন ডলার সামরিক ব্যয়ে মাত্র ৫টি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যেখানে একই অর্থ সামাজিক খাতে বিনিয়োগ করলে অনেক বেশি কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে-কেন এই সামরিকীকরণ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্বব্যাপী সম্পদ ও বাজার দখলের প্রতিযোগিতায়। বিশেষত জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সরকার পরিবর্তন বা সরাসরি সামরিক অভিযান-এসবের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থই প্রধান চালিকা শক্তি।

এই প্রক্রিয়ায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং একটি জোটভিত্তিক শক্তি কাজ করে। এখানে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল, ভলোদিমির জেলেনস্কি-এর ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মিত্র রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জোট একটি ‘ওয়ার মেশিন’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা।

১৯৯০-এর দশকে ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The End of History-এ দাবি করেছিলেন, পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। উপসাগরীয় যুদ্ধ, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমানের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত-সবই প্রমাণ করে, এই ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এখনো বিদ্যমান।

পুঁজিবাদ মূলত মুনাফাকেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থা। আর যখন এই মুনাফা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহৃত হয়, তখন তা সাম্রাজ্যবাদে রূপ নেয়। Imperialism, the Highest Stage of Capitalism গ্রন্থে লেনিন যে বিশ্লেষণ করেছিলেন-সাম্রাজ্যবাদ অবশ্যম্ভাবীভাবে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়-তা আজও প্রাসঙ্গিক।

বর্তমান বিশ্ব সেই বাস্তবতার আরও নগ্ন রূপ প্রত্যক্ষ করছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বৈশ্বিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা সত্ত্বেও সংঘাত কমেনি; বরং নতুন রূপে বিস্তৃত হয়েছে। ‘হাইব্রিড ওয়ার’, ‘প্রক্সি ওয়ার’ কিংবা ‘ইকোনমিক স্যাংশন’-এসব নতুন কৌশল পুরোনো উদ্দেশ্যকেই বহন করছে।

এই পরিস্থিতিতে মানবজাতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-কোন পথে এগোনো উচিত? একদিকে রয়েছে প্রতিযোগিতা, দখল এবং সংঘাতনির্ভর একটি ব্যবস্থা; অন্যদিকে রয়েছে সহযোগিতা, সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক একটি বিকল্প ধারণা। ইতিহাস দেখিয়েছে, কোনো ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। পরিবর্তন অনিবার্য।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি এবং বৈষম্যবিরোধী সংগ্রাম-এসবই একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে গাজা, তেহরান থেকে এই বঙ্গভূমি-সবখানেই মানুষ শান্তি, মর্যাদা এবং ন্যায্য অধিকার চায়।

অতএব, আজকের এই অস্থির বিশ্বে প্রয়োজন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি-যেখানে শক্তির পরিবর্তে মানবিকতা, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা এবং যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যথায় ‘মহানতা’র নামে যে আগ্রাসন চলছে, তা শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

সময়ের দাবি তাই স্পষ্ট-যুদ্ধের অবসান, সাম্রাজ্যবাদের অবসান এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। মানবমুক্তির সেই স্বপ্নই হয়তো একদিন ঘোষণা করবে-

The End of War, The End of Imperialism.

লেখক: ব্যাংকার, কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক


ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ডেইলি ষ্টার লাইন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ICT- Starline Group