বরেণ্য সাংবাদিক ও ব্যাংকার ফিরোজ আলম আর নেই, তিনি গত হয়েছেন গেল রাতে। কর্মজীবনে ব্যাংকার হয়েও মানুষটা মন-মগজে ছিলেন আপাদমস্তক সাংবাদিক। প্রশান্তিময় হোক মানুষটার পরকাল। ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার কোন এক জন্মদিন লিখেছিলাম, যেখানে তার জীবনে অল্প কথায় প্রকাশ করার প্রয়াস ছিলো। পরিমার্জন করে তা ফের তুলে ধরলাম।
চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চেহারায়ও বয়সের ছাপ পড়েছে। পড়ারই কথা, জীবনের ৫৯টি শীত বসন্ত পার করেছেন। তার সাথে আমার বয়সের ফারাক বিস্তর। কিন্তু তাতে কি? পিতৃতুল্য মানুষটার সাথে আমার জমতো বন্ধুর মতই । ফেনী শহরের রাজাঝি দীঘির পাড়ে গল্প করতে করতে কত যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে তার হিসেব রাখিনি দু’জনের কেউই।
একটা মানুষ সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে কতটা উদার আর অসাম্প্রদায়িক হলে এমনটা হতে পারে তা আমার বোধিরাজ্যের চিন্তার উন্মেষ ঘটায়। একজন ফিরোজ আলম, ৮০’র দশকের উচ্চ শিক্ষিত টগবগে যুবকের প্রথম পথচলা সাংবাদিক পাড়াতেই। ব্যাটে-বলের খবরগুলো সুনিপুন হাতে তুলে আনতেন পাঠকের কাছে। ছিলেন একজন আপাদমস্তক ক্রীড়া সাংবাদিক। সাংবাদিকতার অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও ছিল সমান দক্ষতা।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনার পাঠ চুকে যাওয়ার পর স্বপ্ন দেখতেন বাকি জীবন সাংবাদিকতার রাজ্যে বসবাস করার। কিন্তু সে স্বপ্ন তার দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। যখন দেখলেন এ পেশা চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আবৃত। পারিবারিক টানা পোড়নে তাই ছেড়েই দিতে হলো প্রাণের পেশাটাকে। হয়ে গেলেন জীবিকার খোঁজে ১০-৬টার ব্যাংক কর্মকর্তা। বাকি জীবনটা কাটাচ্ছেন সোনালী ব্যাংকের হিসেবের টেবিলে।
সেখানে বেশ নাম যশও করেছেন। যোগ্যতার পরিচয় দেখিয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকতার নেশা কি ছাড়তে চায়? আর সে নেশার কারণেই নিয়মিত খেটে গেছেন পাক্ষিক ফেনী চিত্র’র জন্য। শেষ জীবনে এসে তাঁর পৃষ্ঠোপোষকতায় ফেনী থেকে প্রকাশিত হচ্ছে সুপ্রভাত ফেনী নামের সুপাঠ্য দৈনিক।
এ কাগজটির সূত্র ধরেই মানুষটার সাথে আমার উঠবস। ২০১৫ সালে যখন কাগজটি প্রকাশের ছাড়পত্র পেলো-তখন থেকে তার সাথে কাজের অভিজ্ঞতা। নানা ব্যস্ততায় এখন সে কাগজটিতে সময় দিতে না পারলেও তিনি ছুটে আসেন। গল্প হয়, আড্ডা হয়, এ জনপদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়।
হঠাৎই ফোন দেন-ওপাশ থেকে বলেন-ডালিম, ফিরোজ আলম বলছি। তুমি কেমন আছ? যদি ফ্রি থাক দেখা করো, অনেক আলাপ জমে আছে। মানুষটার সাথে চলতে ভাল লাগে- কারণ তার কথায় জ্ঞান আছে,রস আছে, তথ্য-উপাথ্য আছে। তার সাথে আলোচনায় উঠে আসে এ জনপদের নানা আখ্যান।
বোঝা যেতো মানুষটা এখোনো রাত জেগে পড়েন, ভাবেন। ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা করেন। এ শহরে যে ক’জন সাংবাদিককে দেখেছি, তারা সবাই অনেকটা খালি কলসীর মত। এর পুরাটাই ব্যতিক্রম তিনি, তার মস্তিষ্কে যে জ্ঞান আছে তা তার সাথে আলাপেই বোঝা যায়।
এ মানুষটি জন্ম ১৯৬৬ সালে ফেনী শহরতলীর বিরিঞ্চি গ্রামের কোন এক শুভক্ষণে। পিতা মরহুম আহছান উল্ল্যা ছাদেক, ছিলেন ব্যবসায়ী। মাতা নুরের নাহার রেখা। ৫ ভাই ১ বোনের মধ্যে সবার বড়। বিবাহিত, স্ত্রী আমেনা জোহরা, দুই ছেলে এক মেয়ের জনক।
বিরিঞ্চি আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করার পর . ১৯৮২ সালে ফেনী জি এ একাডেমী থেকে এসএসসি, ১৯৮৪ সালে ফেনী কলেজ থেকে আই কম, ১৯৮৮ সালে নোয়াখালী সরকারী কলেজ থেকে বি.কম এবং পরে সাদার্ণ ইউনিভাসিটি থেকে এম .এ ডিগ্রী অর্জন করেন।
সাবেক তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জাব্বারের বাংলাভাষায় প্রথম কম্পিউটারাইজড পত্রিকা আনন্দপত্র দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু ৯০এর দশকে। স্পোটর্স রিপোটার হিসাবে দৈনিক মিল্লাত , লাল সবুজ, কালবেলা, দৈনিক রূপালী তে কাজ করেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ক্রীড়া পাক্ষিক খেলা পত্রিকায় প্রথমে রিপোর্টার পরে নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব ও পালন করেন । ছিলেন ক্রীড় বিষয়ক ফিচার লেখক। নানা পত্রিকায় তার অনেকগুলো ফিচার ছাপা হয়েছে।
১৯৯৩ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকুরি নেন। অবসরের সময় তিনি সিনিয়র অফিসার ও শাখা ব্যবস্থাপক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তবে চাকুরির পাশাপাশি অবসর সময়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার নিয়মিত লেখালিখে চালিয়ে গেছেন।
এই যে ছবিটা দেখছেন- এটাও আমার নিজের তোলা। কোন এক শীতের সকালে এমন ডজনখানেক ছবি তুলে দিয়েছিলাম। পকেটে ৫'শ টাকার নোট গুজে দিয়ে বলেছিলেন- এটা দিয়ে নাস্তা করো। এটা পারিশ্রমিক নয় ভালবাসা।
পরিশেষে মানুষটার পরের জীবনের জন্য প্রশান্তি কামনা করছি। মহান রব তাকে উত্তম প্রতিদান দিক।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |