নুর উল্লাহ কায়সার,
বেগম খালেদা জিয়ার পৈত্রিক জেলা ফেনীতে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে জামায়াতের ভোটের হার। বিগত নির্বাচনগুলোতে ফেনীতে জামায়াতের ভোটের হার প্রদত্ত ভোটের ২০ ভাগের নিচে থাকলেও এবার তা পৌঁছেছে ৩৯ ভাগে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ পূর্ববর্তী নির্বাচন সমূহের প্রাপ্ত হার বিশ্লেষন করে ফেনীতে ভোটের মাঠের এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে; আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে ফেনীতে বিএনপির রাজনীতি খুটিয়ে খুটিয়ে চললেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা স্থায়ী রূপ নেয়। এসময় জেলার বিভিন্ন সাংগঠনিক কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও নতুন কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি দলটি। কিছু কিছু কমিটি বারবার আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি বিএনপি। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সক্রীয় থাকতে না পারলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের কোনরূপ স্থবিরতা ছিলোনা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফেনীর ৩টি সংসদীয় আসনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী। এক সময়ে বিএনপির সাথে ভোটের মাঠে জামানত হারানো দলটির নেতারা এখন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে নিজেদের জানান দিয়েছে। আগামীতে স্থানীয় সরকারের যে কোন নির্বাচনেই বিএনপির সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুুতি নিচ্ছে জামায়াত। বিএনপির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, অন্ত:কোন্দল নিরসন ও যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে না দিতে পারলে ক্রমেই ফেনীতে বিএনপির ভোট ব্যাংক জামায়াতের দখলে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজণৈতিক বিশ্লেষকরা।
জেলার ৩টি আসনে ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, জেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার ৭২ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তন্মধ্যে বিএনপি ৪ লাখ ৮ হাজার ৫৩৯ ভোট ও জামায়াত জোট পেয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩৩ ভোট। অথ্যাৎ প্রদত্ত ভোটের ৫৭ দশমিক ৫৩ ভাগ ভোট পেয়ে ধানের শীষের প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াতের প্রার্থীরা পেয়েছেন ৩৮ দশমিক ৫৬ ভাগ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ফেনীর ৩টি আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের ১৪ ভাগ এবং ১৯৯৬ সালে প্রদত্ত ভোটের ৭ ভাগ পেয়েছিলো জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯১ সালে ফেনী-২ আসনে জামায়াতের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা মকবুল আহমেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ২০ ভাগ ভোট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিগত সংসদ নির্বাচনগুলো বিশ্লেষনে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর শুধুমাত্র ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে ফেনীর ৩টি সংসদীয় আসনে প্রার্থী দেয় জামায়াত। ওই সময়ে জেলার কোন আসনেই জামায়াতের পক্ষে ২০ ভাগের বেশি ভোট পড়েনি। কিন্তুু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৩৯ ভাগ ভোট অধিকারে নিয়ে জেলাজুড়ে জামায়াত তাক লাগিয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ছড়িয়ে দিয়েছে।
জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার পৈত্রিক জেলা ফেনীর ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া নিয়ে ফেনী-১ আসন গঠিত। এ আসনে খালেদা জিয়া ৪ বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ৩ বার প্রধানমন্ত্রী এবং ১ বার বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে সর্ব প্রথম খালেদা জিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াত প্রার্থী মাত্র ৮ দশমিক ৬৭ ভাগ ভোট পান। পরে ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াত প্রার্থী মো. ইউনুছ মাত্র ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট পান। পরবর্তী ২০০১ এবং ২০০৮ সালে এ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। বিগত দুই বারের নির্বাচনে জামায়াত তাদের ভোটের ৮ শতাংশের উপরে নিতে না পারলেও এবার এ আসনে জামায়াত এক লাফে ৪০ দশমিক ২৯ ভাগ ভোট অর্জন করেছে। ওই আসনে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহবায়ক রফিকুল আলম মজনু। তিনি ৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরআগে ফেনী-১ আসনে বিপুল ভোটে খালেদা জিয়া বিজয়ী হলেও এবার ৫৬-৪০ ভাগ ভোটের কাছাকাছি ব্যবধানে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী।
ফেনীর দাগনভূঞা, সোনাগাজী নিয়ে জাতীয় সংসদের ফেনী-৩ আসন গঠিত। এ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিবারই ধানের শীষ প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারের পাশেও ছিলো না জামায়াত। ১৯৯১ সালে সর্ব প্রথম এ আসনে জামায়াতের দাড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে আসেন মো. মোস্তফা। ওই সময়ে ধানের শীষ প্রতীক ৪০ হাজার আর দাড়িপাল্লা পায় মাত্র ১১ হাজার ভোট। পরে ১৯৯৬ সালে এ আসনে দাড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে মাত্র ৭ ভাগ ভোট পান। অথ্যাৎ এ আসনে জামায়াত দুই বার নির্বাচন করলেও ভোটের হার ছিলো সর্বোচ্চ ১৩ ভাগ। কিন্তুু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জামায়াত প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক। নির্বাচনে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আবদুল আউয়াল মিন্টু। আর জামায়াত প্রার্থী মানিক পান ১ লাখ ৮ হাজার ১৬০ ভোট। অথ্যাৎ মোট প্রদত্ত ভোটের ৫৭ ভাগ বিএনপি আর ৩৯ ভাগ পেয়েছে জামায়াত। ১৯৯৬ সালের তুলনায় এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে প্রায় ৫ গুন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত কারণে ফেনী-২ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এ আসন থেকে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ঈগল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখানে এবি পার্টি নির্বাচনে প্রার্থী হলেও তাদের নতুন দলটির সাংগঠনিক জনশক্তি তেমন না থাকায় মূলত জামায়াতের লোকজনই ঈগল প্রতীকের জন্য ভোটের মাঠে শক্তিশালী ভুমিকায় ছিলো। এ আসনে ১৯৯১ সালে মকবুল আহমেদ নির্বাচন করে ২২ হাজার ভোট পান। বিএনপি থেকে ৩৭ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন সহিদ উদ্দিন ফেরদৌস। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক লিয়াকত আলী দাড়িপাল্লা প্রতিকে পান ১১ হাজার ভোট। ওই নির্বাচনে ধানের শীষে ৬২ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াত যথাক্রমে ফেনীর এ আসনে ২০ ভাগ ও ৭ ভাগ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়। কিন্তুু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ১১ দলীয় জোটের শরিক এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ৮০ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এখানে ধানের শীষ প্রার্থী জয়নাল আবেদিন ভিপি পান ১ লাখ ৩১ হাজার ভোট। অথ্যাৎ ধানের শীষ ৫৯ ভাগ আর জামায়াত জোট ৩৬ ভাগ ভোট লাভ করে।
হিসাব অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনীতে মোট প্রদত্ত ভোটের ৫৭ ভাগ বিএনপি এবং ৩৮ ভাগ জামায়াতের অধিকারে আসে। এক সময়ে ফেনী বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও এখানে ভোটের মাঠে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করেছে জামায়াত। আগামী যে কোন নির্বাচনে ফেনীতে যারাই জনপ্রতিনিধিত্বের আসনে বসবেন; তারাই শক্তিশালী জামায়াতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হবেন। ভোটের মাঠের হিসাব থেকে এমনটাই আভাস মিলেছে।
‘দুষ্কৃতিকারীদের ভোট যোগ হয়ে ফেনীতে জামায়াতের ভোট বেড়েছে’
-সদস্য সচিব, ফেনী জেলা বিএনপি
ফেনীতে বিএনপির দুর্গ অক্ষুন্ন রয়েছে দাবী করে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ফেনীতে জামায়াতের ভোট ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে তা সঠিক নয়। এখানে তাদের ১-২% ভোট বেড়েছে এটা সঠিক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু দুস্কৃতিকারী দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে জামায়াতকে ভোট দেয়ায় জামায়াতের ভোটের সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে আমরা আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। আগামীর যে কোন নির্বাচনে বিপুল ভোটে আমাদের প্রার্থীরাই বিজয়ী হবে।
‘শৃঙ্খলিত মানবিক কাজ আমাদেরকে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে’
-আমীর, ফেনী জেলা জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ফেনী জেলা আমীর মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এদেশের গতানুগতিক কোন রাজনৈতিক দল নয়। জামায়াত একদল যোগ্য এবং দক্ষ কর্মী বাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় জামায়াতের কর্মীদের নৈতিক প্রভাব ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ভোটারদের কাছে টেনেছে। এছাড়াও করোনা ও বন্যাকালীন সময়সহ যে কোন বিপদে আপদে মানুষ জামায়াতের নেতাকর্মীদের পাশে পেয়েছে বলেই তারা জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে।
‘জামায়াতের ভোট বাড়ার ক্ষেত্রে কোন ম্যাজিক ছিলো না’
-সাধারণ সম্পাদক, সুজন, ফেনী
সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক ফেনী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ফেনীতে জামায়াতের ভোট বাড়ার ক্ষেত্রে কোন ম্যাজিক কাজ করেছে বলে আমি মনে করি না। কারণ বিগত ১৭ বছর জামায়াত প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না পেলেও তারা গোপনে শতভাগ সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান রেখেছে। ২০১৯ সালে করোনাকালীন সময়ে এবং ২০২৪ এর ভয়াবহ বন্যার সময়ে জামায়াতের মানবিক কার্যক্রম ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। এছাড়াও ফেনীতে গণঅভ্যূত্থানের পরপরই জামায়াতের প্রার্থীরা ভোটারদের টার্গেট করে মাঠ চষে বেড়ানোয় ভোট বেড়েছে।
| ফজর | ৫.০০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪.৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬.০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৫০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৩০ মিনিট দুপুর |