
বিশেষ প্রতিনিধি, Reporter।।
শাখাওয়াত হোসেন টিপু
দাগনভূঞায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা ও দাপটের কারণে বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং তারা এক চরম অর্থনৈতিক দুর্দিনের মুখোমুখি হচ্ছেন। সড়ক-মহাসড়ক এবং শহরের অলিগলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিপত্য সিএনজি চালকদের জীবিকাকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভাড়ার ব্যবধান ও যাত্রী আকর্ষণ: সিএনজি অটোরিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার ভাড়া অনেক কম। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে যাত্রীরা বেশি টাকা খরচ করে সিএনজিতে না উঠে সহজেই কম ভাড়ার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করছেন।
সহজ প্রাপ্যতা: অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কের মোড়ে মোড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা সারাক্ষণ পাওয়া যায়। ফলে যাত্রীরা সিএনজি খোঁজার ঝামেলা এড়াতে এগুলোতেই উঠে পড়েন।
অসম প্রতিযোগিতা ও সরকারি খরচ: সিএনজি চালকদের সরকারকে নিয়মিত কর দিতে হয়, লাইসেন্স ও ফিটনেস নবায়ন করতে হয় এবং মালিকের জমা (জমা ভাড়া) গুণতে হয়। অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর সিংহভাগই অবৈধ বা নীতিমালার বাইরে চলায় তাদের এই ধরণের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক খরচ বহন করতে হয় না।
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট: সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে গিয়ে চালকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো রাতের বেলা গ্যারেজে বা চার্জিং হাবের মাধ্যমে চার্জ হয়ে সারাদিন অনায়াসে চলতে পারে।
মালিকের জমা তুলতে হিমশিম: ট্রিপ বা যাত্রী কমে যাওয়ায় সারাদিন গাড়ি চালিয়ে সিএনজি চালকরা যে টাকা আয় করছেন, তা দিয়ে মালিকের দৈনিক জমা ও গ্যাসের খরচ মেটানোর পর পরিবারের জন্য সামান্যই অবশিষ্ট থাকছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট এবং সমন্বিত পরিবহন নীতিমালা না থাকার কারণে এই দুই যানের চালকদের মধ্যে এক ধরণের অসম ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা সিএনজি চালকদের প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দাগনভূঞা পৌর শহর ও উপজেলার বিভিন্ন সড়ক এবং গ্রামীণ রুটে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বেকার অনেক মানুষও এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাম প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মালিকরা এসব গাড়ি চালকদের কিস্তিতে দেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদিন সন্ধ্যা বা রাতে প্রায় ৪০০ টাকা করে জমা নেওয়া হয়। এক বছরের মধ্যে কিস্তি পরিশোধের পর গাড়িটি চালকের মালিকানায় চলে যায়। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক
আবু তৈয়ব জানান, তিনি নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে প্রায় এক বছর আগে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে দাগনভূঞায় আসেন। জামানত হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে একটি অটোরিকশা কিস্তিতে নেন। কিস্তির টাকা পরিশোধের পর এখন গাড়িটি তার নিজের হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এর মধ্যে ব্যাটারি চার্জ বাবদ প্রতিদিন রাতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা খরচ হয়।
দাগনভূঞাকে বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এখানকার মানুষ অল্প দূরত্বেও গাড়িতে চলাচল করেন। শহরের আশপাশে গেলেই ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া পাওয়া যায়। অনেক যাত্রী বখশিশও দেন। তাই এখানেই থেকে গেছি।"
অন্যদিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক আবুল হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগেও সিএনজি ছাড়া যাত্রীদের চলাচলের তেমন বিকল্প ছিল না। এখন দূরের যাত্রা ছাড়া অনেকেই সিএনজিতে উঠতে চান না। ফলে আয় অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, "আগে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এখন সারাদিন সড়কে থেকেও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ প্রতিদিন গ্যাস বাবদ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়। তার ওপর গ্যাস নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টাও চলে যায়। কিস্তি, গাড়ির খরচ ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, আয় কমে যাওয়ায় কেউ কেউ ইতোমধ্যে সিএনজি চালানোর পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তার মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধিই যাত্রী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এক মালিক মাসুদ জানান, দাগনভূঞা পৌর শহরে তার শতাধিক অটোরিকশা রয়েছে। তার নিজস্ব গ্যারেজও রয়েছে। প্রতিটি গাড়ি চার্জ দেওয়ার জন্য তিনি প্রায় ৮০ টাকা করে নেন। কিস্তিতে
গাড়ি দিয়ে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় বলে জানান তিনি। তবে এ ব্যবসায় ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান মাসুদ। তার ভাষ্য, গাড়ি নিয়ে চালক পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে জামানত ও চুক্তিপত্র নিয়ে গাড়ি দেওয়া হয়। তার মতো আরও অনেকেই এভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবসা করছেন।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সহজে পাওয়া যায় এবং তুলনামূলক কম ভাড়ায় কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করা যায়। ফলে দৈনন্দিন যাতায়াতে মানুষের সুবিধা হয়েছে। তবে অনেক যাত্রী অদক্ষ ও নতুন চালকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, অনেক চালক বয়সে কম এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। ফলে সড়কে বেপরোয়া বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানোর ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি এসব গাড়ির ব্যাটারি চার্জের কারণে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি বাড়ছে বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন।
সচেতন নাগরিকদের মতে, ব্যাটারিচালিত কিংবা সিএনজিচালিত- যে কোনো যানবাহনই দক্ষ চালকের হাতে নিরাপদ। তাই যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চালকদের বয়স, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে পৌর এলাকার বাইরে যথাযথ নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়নভিত্তিক নিবন্ধন বা পরিচয়পত্রের আওতায় আনা হলে দুর্ঘটনা কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে চালককে শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে এসব যানবাহন না দেওয়ার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।