বুধবার ২৪ জুলাই ২০১৯  ৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ জিলকদ্দ, ১৪৪০ Untitled Document

মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা সুরক্ষায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি জরুরি

Untitled Document
হালনাগাদ :২০১৯-০৪-০২, ১১:১৬

বিশেষ প্রতিনিধী

ফজলুল হক ভূইয়া রানা: “যাঁদের আত্মত্যাগ আর প্রাণের বিনিময়ে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিল, সেই মুক্তিযোদ্ধারা এক সময়ে ছিল অবহেলিত। বলা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর একটানা ২১ বছর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় প্রদান করাও রীতিমতো এক ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রকৃত সম্মান লাভ করার সুযোগ পান। পরবর্তী সময় আরো দুই দফায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু বিগত ৪৮ বছরেওমুক্তিযোদ্ধাদের আইনি স্বীকৃতি মিলেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যার আন্তরিকতা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদান করছে না। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মতো জাতীয় অনুষ্ঠানেও মুক্তিযোদ্ধারা আমন্ত্রিত হন দায়সারাগোছে। এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব অনুষ্ঠান হয়, সেখানে অভিভাবদন যিনি গ্রহণ করছেন তিনি স্বাধীনতা পক্ষের না বিপক্ষের সেটিও বিবেচনা করা হয় না। অথচ, বীর যোদ্ধা হিসেবে স্থানীয়ভাবে কমান্ডার বা সমপর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাকে ওইসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত করে অভিবাদন গ্রহণের সুযোগ দিলে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন সম্মানবোধ করতেন। তেমনি নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে আরো অনুপ্রাণিত হতো।”
কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রংপুর জেলা কমান্ডের সহকারী কমান্ডার (অর্থ) মাহবুবুর রহমান। ভারতের মুক্তি সেনানিবাসে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী প্রথম ব্যাচের ৭২ জনের মধ্যে তিনিও ছিলেন। ওই ব্যাচেই জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পঁচাত্তরের কালোরাতে ঘাতকের হাতে নিহত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই শেখ কামালও ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণায় তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গত মার্চ মাসে রংপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা সফরকালে এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। প্রসঙ্গত, ঐতিহাসিক ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরুকরে ভাষা আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে রংপুরের রয়েছে অনেক সমৃদ্ধ ইতিহাস। সেই ধারাবাহিকতায় স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও রংপুরবাসীর রয়েছে গৌরবগাঁথা কাহিনী।
বক্তব্যের শুরুতে মাহবুবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির শোষণ-বঞ্চনা আর অব্যাহত নির্যাতনের কারণেই এ দেশের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জন্ম নেয়। সেই আকাঙ্খাকে তীব্র করে বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মূলত ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ৩ মার্চ ঢাকা, সিলেট ও রংপুর থেকেই। ইয়াহিয়া খানের কূটকৗশলের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল ডাকেন। হরতাল সফল করতে আগের দিন ২ মার্চ রাতে রংপুরে ছাত্রলীগ নেতারা সেন্ট্রাল রোডের পাঙ্গা হাউসের (বর্তমান গ্রামীণ টাওয়ার) ছাদে এক সভা করে। আমিও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে সেখানে ছিলাম। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরের দিন সকালে দলমত নির্বিশেষে সবাই শহরের জিরো পয়েন্ট কাছারি বাজারে জমায়েত হয়ে সেখান থেকে একটি মিছিল বের করে। ওই মিছিল রেলস্টেশন হয়ে ফিরে আসার পথে বর্তমান ঘোড়াপীর মাজারের সামনে অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসার ছাদ থেকে মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন শংকু সমাঝদারসহ কয়েকজন। শংকুর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লেই গোটা শহর রূপ নেয় এক ভয়াল শহরে।
তিনি বলেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। নিরাপত্তার কারণে আগে থেকেই আমরা বাড়ির বাইরে ছিলাম। ২৬ মার্চ রাতে বাড়ি আসি। ওই সময় এমপি সিদ্দিক হোসেন খবর পাঠান। সেখানে আমি ছাড়াও কারমাইকেল কলেজের ভিপি আবদুর রউফ, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম, ছাত্রলীগ কর্মী মুক্তার এলাহীসহ অনেকে ছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় ২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার। কর্মসূচী অনুযায়ী ওই দিন লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বল্লম ইত্যাদি সহযোগে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে এগিয়ে যায় রংপুরবাসী। পাকিস্তানী সৈন্যরা সেদিন মারণাস্ত্র নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার উপর ঝাপিয়ে পরে এবং অসংখ্য মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন অন্তত সাড়ে ছয়শ’ মানুষকে হত্যার পর আগুনে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়।
৩ এপ্রিল মধ্যরাতে রংপুরের প্রথম গণহত্যা ঘটে দখিগঞ্জে। সেদিন ১১ জনকে দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। ৪ এপ্রিল পাকিস্তানী সৈন্যরা আমার বাড়িতে হামলা চালায়। তারা আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে এনে নির্যাতন চালায়। পরে ওই ভাবীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিনই রংপুর জেল সুপার আবদুর রব পার্শ্ববর্তী ইপিআর ক্যাম্পে বাঙালিদের সরে যাবার জন্য গোপনে খবর পাঠান। তবে পালিয়ে যাবার পথে ৭০ জন ইপিআর বাঙালি সৈনিক ধরা পড়ে। পরে তাদের হত্যা করা হয়। উপায়ন্তর না পেয়ে ৫ এপ্রিল দেশ ছেড়ে ভারত যাই। সেখানে সিদ্দিক হোসেন এমপি, আওয়াল এমপিসহ পরিচিত অনেককে পেয়ে সাহস পাই। আমরা প্রথমে টাকুরহাট বিএসএফ ট্রেনিং সেন্টার যাই। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের মুক্তি সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম ব্যাচে আমরা ৭২ জন প্রশিক্ষণ নেই। সেখানে জাতির জনকের পুত্র শেখ কামালের দেখা পাই। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের একটি গ্রুপকে চিলারহাটি হেমকুমারীতে অপারেশনের জন্য পাঠানো হয়। আমাদের প্রথম দায়িত্ব পড়ে চিলারহাটি রেলব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া। তখন ওই ব্রিজ সার্বক্ষণিক পাহারার দায়িত্বে ছিল রাজাকাররা। কৌশল হিসেবে আমরা বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার নষ্ট করে দেই। এলাকাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে আমরা অপারেশনে সফল হই।  
মাহবুবুর রহমান জানান, বর্বর পাক সেনাদের পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি ধারণ করে রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি। এর মধ্যে অনেকগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কেন্দ্রস্থল ছিল রংপুর টাউন হল। অনেককে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে লাশ টাউন হলের পুকুরে ফেলা হয়েছিল।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রণয়ন হয়নি। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাষ্কর। একইভাবেমুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ১৬ ডিসেম্বর কিংবা ২৬ মার্চ এ দুইদিন স্থানীয়ভাবে প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও বছরের বাকী সময় তাঁদের খোঁজ কেউ নেয় না। তাছাড়া দুইটি জাতীয় দিবসে অভিবাদন গ্রহণের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানালেন একাত্তরের এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মতে, এ দু’টি দিবসে অন্তত স্থানীয় পর্যায়ের কমান্ডার বা বেঁচে থাকা মুক্তিয়োদ্ধা অন্য কাউকে অভিবাদন গ্রহণের সুযোগ দিলে এটি আরো অর্থবহ এবং তাৎপর্য হয়ে ওঠতো। তাছাড়া নতুন প্রজন্মও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে আরো অনুপ্রাণিত হতো। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, কোনো কাজে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে অপ্রীতিকর কথাবার্তা শুনতে হয় কিংবা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। একমাত্র জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সব সময় দুর্বল থাকেন। এ কারণে হয়তো কোনো কোনো কর্মকর্তা শুধু কথার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করেন, কিন্তু আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা যায়। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদানের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। এ জন্য বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও সম্মানের ক্ষেত্রে হেরফের না হয়। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতীয় বীর’ ঘোষণা সময়ের দাবি হয়ে ওঠেছে। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ১০ হাজার টাকার করে যে সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে, বর্তমান বাজার তুলনায় তা অপর্যাপ্ত। এক্ষেত্রে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানান।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্যোন্নয়ন এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার স্বার্থেই মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রয়োজন। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হচ্ছে তাতে একদিকে যেমন দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ থাকছে, তেমনি তালিকা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ। তাঁর মতে, ভারতীয় তালিকা, প্রতিটি ক্যাম্প ও ট্রেনিং সেন্টারের তালিকা এবং অস্ত্র জমা দেয়ার স্লিপ যাচাই করলেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। পাশাপাশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবিদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার ঘোষিত সুযোগ-সুবিধার লোভে অনেকে বিভিন্ন অনৈতিক উপায়ে মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন।
সকল জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে এ বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সব জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স কিংবা ভাস্কর্য একই ডিজাইনের হওয়া উচিত। যাতে করে মানুষ সহজেই চিনতে এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। কাজেই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্নিবেশিত করা ছাড়াও শিক্ষার্থীদের সেটি আত্মস্থ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন উৎসবে মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যত্র ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা’ কর্মসূচী চালু করা হলে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

 

July 2019

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

সর্বাধিক পঠিত
জেলা সংবাদ
সংশ্লিষ্ট সংবাদ
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno