বুধবার ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ৫ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানি, ১৪৪০ Untitled Document

গবেষক রানার সাথে আলাপকালে মাদারীপুর  জেলা কমান্ডার শাহজাহান হাওলাদার

Untitled Document
হালনাগাদ :২০১৮-১০-১৪, ১১:৩২

বিশেষ প্রতিনিধী

ফজলুল হক ভূইয়া রানা: মুক্তিযুদ্ধকালে বর্তমান মাদারীপুর জেলা ছিল ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা। তবে বিভিন্ন কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাদারীপুরের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কেননা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির অন্যতম ক্ষেত্র ছিল মাদারীপুর মহকুমা। শেখ মুজিবুর রহমান মাদারীপুর ইসলামিয়া স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান মাদারীপুরে চাকরি করেন। এ সুবাদে শিশুকাল থেকে মাদারীপুরের সাথে বঙ্গবন্ধুর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুরের জনগণ বঙ্গবন্ধুর আহবানে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসেন।


যদিও একাত্তুরের ২৫ মার্চ থেকে সারা দেশে হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট শুরু হলেও মাদারীপুরে শুরু হয় একমাস পর অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল থেকে। এর আগে ২২ এপ্রিল রাতে পাকিবাহিনী বিমান থেকে মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের লিয়াজোঁ অফিস শহরের মিলন সিনেমা হল এবং আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বাড়ি লক্ষ্য করে প্রথম গোলাবর্ষণ করে। এতে মাদারীপুরবাসী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে থাকে। ২৪ এপ্রিল স্থলপথে বিনা বাধায় হানাদার বাহিনী টেকেরহাট ফেরি পার হয়ে সদর থানার মস্তফাপুর হয়ে মাদারীপুর শহরে প্রবেশ করে। মাদারীপুরে প্রবেশ করেই পাক বাহিনী জ্বালাও-পোড়াও, গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের মত জঘন্য কাজে মেতে ওঠে। ’৭১ এ হানাদার বাহিনী বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করলেও মূল ক্যাম্প ও টর্চার সেল ছিল এ.আর.হাওলাদার জুট মিলের ডি-টাইপ বিল্ডিং। তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার মধ্যে এ ক্যাম্প ছিল হানাদার বাহিনী মিনি ক্যান্টনমেন্ট। এখান থেকে মাদারীপুর-শরীয়তপুর অঞ্চল জুড়ে শুরু করে ধ্বংসলীলা। নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যায় মেতে ওঠে হানাদার বাহিনী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় টর্চার সেল ছাড়াও মাদারীপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় হানাদার বাহিনী গণহত্যা ঘটিয়েছে। রাজাকারদের সহযোগিতায় গ্রামে গ্রামে হানা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও মুক্তিকামী নর-নারীকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করে এবং হাজার হাজার বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও সম্মুখযুদ্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উকিলবাড়ি যুদ্ধ, পাখুল্লার যুদ্ধ, কালকিনির যুদ্ধ, কমলাপুর, বাহাদুরপুর, কলাগাছিয়া, চৌহদ্দী, রাজৈর বোলগ্রাম, পাথুরিয়ারপাড়, নবগ্রাম, কলাবাড়ি, শিবচরের বাহাদুরপুর ও সমাদ্দার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই জেলা শত্রুমুক্ত হয়।

 
এ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিটের কমান্ডার আলহাজ্ব শাহজাহান হাওলাদার জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ অনেকে বড় বড় চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। আমলা, ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ হতে পারছেন। কাজেই জাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকালে যার যা অবদান, তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে ধারণা দিতে জেলায় জেলায় বধ্যভূমি, টর্চার সেল কিংবা গণকবরের স্থানসমূহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণায় তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি মাদারীপুর সফরকালে তাঁর সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়।  
যুদ্ধকালীন অপারেশন কমান্ডার শাহজাহান হাওলাদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল মূলতঃ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন। তাঁর নেতৃত্বেই গোটা বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় মাদারীপুরের মুক্তিপাগল তরুণরা সংগঠিত হয়। শাহজাহান হাওলাদার জানান, ’৭১-র ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, মাদারীপুরের নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে বিশেষ ব্যবস্থায় সেটি সম্প্রচার করা হয়। ওই ভাষণ শুনতে সেদিন হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছিল। ভাষণের পর পরই বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করি এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু। পরে ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মাদারীপুর শহরের মিলন হল এবং অন্যত্র বিমান দিয়ে হামলা চালিয়ে বোমা বর্ষণ করলে আমরা রাজৈর হয়ে ভারত চলে যাই। সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে বিভিন্ন যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেই।
সকল জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে শাহজাহান হাওলাদার বলেন, সব জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স একই ডিজাইনের হওয়া উচিত। যাতে করে মানুষ সহজেই চিনতে এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। 
স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ও দুরূহ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন শাহজাহান হাওলাদার। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রণয়ন করতে হলে প্রয়োজন নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তথ্য-উপাত্ত। একমাত্র প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে ভুয়া ও অমুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশি।
এ প্রসঙ্গে তিনি স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক অতিবাহিত হবার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সম্পন্ন না হওয়ায় আক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হচ্ছে তাতে একদিকে যেমন দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ থাকছে, তেমনি তালিকা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ। এতে করে অনেক অমুক্তিযোদ্ধা টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা বনার সুযোগ পাচ্ছেন। তার মতে, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং দালিলিক প্রমাণ দেখে ক্রস চেক করে নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি সম্ভব। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন কিংবা বয়স্কদের কাছ থেকে গোপনে তথ্য নিয়ে সেটি যাচাই করলেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে চিহ্নিত করা সম্ভব। এরপরও কোনো ভুয়া ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি যারা অসধুপায়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। শাস্তির দু-চারটি ঘটনা দৃশ্যমান হলেই ভুয়া দাবির প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।


এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মাদারীপুরে  তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ৮শ’র মতো। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৭ জন। এদের প্রায় সকলেই সরকার প্রদত্ত ভাতা পাচ্ছেন। তবে প্রশাসনিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের উপেক্ষা ও অবহেলা নিয়ে রয়েছে কিছুটা অনুযোগ। তাঁর মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর নেতৃত্বেই আমরা পরিবার-পরিজন এবং নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ অনেকে বড় বড় চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জন সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস কিংবা ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসÑ এ দুইদিন স্থানীয়ভাবে প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও বছরের বাকী সময় তাঁদের খোঁজ কেউ নেয় না। বরং কোনো কাজে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে অপ্রীতিকর কথাবার্তা শুনতে হয় কিংবা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদানের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। এ জন্য বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও সম্মানের ক্ষেত্রে হেরফের না হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রথম শ্রেণীর মর্যাদায় বিনামূল্যে যাতায়াত, চিকিৎসা সুবিধাসহ বাসস্থানের ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া সরকারি দফতরে গিয়ে কাজের সুবিধার্থে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে বিশেষ পরিচয়পত্র দিতে হবে। যাতে করে সচিবালয়সহ সর্বত্র অবাধে যাতায়াত সম্ভব।

ক্যাপশন
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশনার্থে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আলহাজ্ব শাহজাহান হাওলাদারের সাক্ষাতকার গ্রহণ করছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও দৈনিক আমার কাগজ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফজলুল হক ভূইয়া রানা।
 

December 2018

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

সর্বাধিক পঠিত
জেলা সংবাদ
সংশ্লিষ্ট সংবাদ