বুধবার ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ৫ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানি, ১৪৪০ Untitled Document

একটি নজরুল-জীবনীর সন্ধানে

Untitled Document
হালনাগাদ :২০১৬-০২-০৯, ১৪:৩৩

নজরুল ইসলামকে নিয়ে কতগুলো জীবনী লেখা হয়েছে, তার সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে আমার বিশ্বাস, অত জীবনী অন্য কোনো বাঙালিকে নিয়ে লেখা হয়নি, এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও নয়। এর একটা কারণ নজরুল সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব। বিশেষ করে সৈন্যবাহিনী থেকে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার আগের সময়টা আমাদের কাছে একান্ত অস্পষ্ট। শোনা কথা, যে যা কল্পনা করতে পেরেছেন, তিনি তাই লিখেছেন।
তাঁর সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারতেন, এমন কোনো যোগ্য আত্মীয় তাঁর ছিল না। তাঁর দুই ভাই ছিলেন, লেখাপড়া সামান্যই জানতেন। তাঁরা তাঁর জীবন সম্পর্কে নতুন কোনো আলোকপাত করতে পারেননি। তাঁরা দেখেছিলেন বালক এবং কিশোর নজরুলকে, যাঁর বালকসুলভ কাজকর্ম তাঁদের মনে থাকার কথা নয়। সুতরাং তাঁদের কাছ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পুত্ররা—সব্যসাচী আর অনিরুদ্ধ—কলকাতা-পূর্ব অধ্যায় সম্পর্কে না হলেও, কলকাতা অধ্যায় সম্পর্কে হয়তো তথ্য দিতে পারতেন। কিন্তু নজরুল যখন মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন তাঁরা বালক মাত্র। তাই তাঁরা কেউ তাঁদের পিতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখেছেন বলে জানি না। আর লিখে থাকলেও, সেও শোনা কথা। নজরুল সুস্থ থাকা অবস্থায় তাঁর কোনো জীবনী প্রকাশিত হলেও তা নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতো। সুতরাং যেসব নজরুল-জীবনী লেখা হয়েছে, সেগুলো অংশত কিংবদন্তিমূলক। এবং বীরপূজা বিশেষ।
তিনি যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারের বিদ্যা অথবা বিত্ত—কোনোটাই ছিল না। এখন যে সে পরিবারের ওপর গৌরব আরোপ করে তাঁর পূর্বপুরুষদের আয়মাদার এবং কাজী ইত্যাদি বিশেষণে বিভূষিত করা হয়, তার কারণ পরবর্তীকালে তাঁর অসামান্য কীর্তি এবং গৌরব। আমরা ধরেই নিই যে, তিনি যখন অমন বড় হয়েছিলেন, তখন তাঁর পূর্বপুরুষেরাও নিশ্চয়ই অভিজাত ছিলেন। এই সিদ্ধান্ত মাথায় নিয়েই আজহারউদ্দীন থেকে শুরু করে নবীনতম নজরুল-জীবনীকার পর্যন্ত লেখকেরা তাঁদের যাত্রা আরম্ভ করেন। কিন্তু নজরুল যা হয়েছিলেন, তা নিজের প্রতিভা দিয়েই হয়েছিলেন, পরিবারের কারণে নয়। তিনি যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারে সন্তানদের জন্মতারিখ পর্যন্ত লিখে রাখার ঐতিহ্য ছিল না। কেউ কি জানে তাঁর বড় ভাই সাহেবজান তাঁর থেকে ক বছরের বড় ছিলেন। অথবা ছোট ভাই আলী হোসেন ক বছরের ছোট ছিলেন? অথবা তাঁর মা কে ছিলেন? পিতা দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু কী করে জীবিকা উপার্জন করতেন? এসব তথ্য খোঁজা বাহুল্য।

গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হলো: তিনি কী করে হঠাৎ একদিন উল্কার মতো বাংলা সাহিত্য এবং সংগীতজগতের মধ্যগগনে আবির্ভূত হয়ে সমস্ত আকাশকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। কী করে তিনি দুখু মিয়া থেকে নজর আলি, নজর আলি থেকে নজরুল এসলাম, নজরুল এসলাম থেকে নজরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম, এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম হয়ে উঠলেন, সেই বিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ এবং আগ্রহব্যঞ্জক।
আসলে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভা। তাঁকে সাধারণ মানুষের মাপে বিচার করতে গেলে ভুল হওয়ারই কথা। কিন্তু আর পাঁচজন মানুষের মতো তাঁকে চিরাচরিত ছকে গড়ে তুলেছেন জীবনীকারেরা। তিনি যে ব্যতিক্রম, সেটা অনেকেই মাথায় রাখেননি। তাঁর বেলাতে প্রতিষ্ঠিত রীতি যে অচল হতে পারে, তাঁরা সেটাও মনে করেননি।
সঠিক তথ্যের অপ্রতুলতা ছাড়াও নজরুল ইসলামের একটি আদর্শ জীবনী লেখার দ্বিতীয় সমস্যা হলো, একেবারে গোড়ার সমস্যা। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের কয়েকটি জীবনী রচিত হলেও, অথবা মুকুন্দরাম ও ভারতচন্দ্র তাঁদের জীবনের কয়েকটি তথ্য রেখে গেলেও, বাংলা ভাষায় জীবনী লেখার কোনো ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। ইরেজি জীবনী-সাহিত্যের আদলে বাংলা ভাষায় জীবনী রচনা আরম্ভ হয় উনিশ শতকে। এবং এর তিনটি মডেল তৈরি হয়। প্রথমত, জন্ম, পরিবার, শিক্ষা, বিবাহ, কর্মজীবন এবং মৃত্যুর মতো একেবারে মৌলিক তথ্যের সংগ্রহ। ঈশ্বর গুপ্ত এ ধরনের জীবনীর সূচনা করেন। নগেন্দ্রনাথ সোম ও যোগীন্দ্রনাথ বসু তাকে উন্নত করেন এবং এর চূড়ান্ত রূপ দেন ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্য-সাধক চরিতমালায়। কিন্তু জীবনী মানে তথ্যের তালিকা নয়। এমনকি সন-তারিখের তালিকাও নয়।
জীবনী লেখার দ্বিতীয় মডেল প্রবর্তন করেন শিবনাথ শাস্ত্রী—তাঁর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ গ্রন্থে। সমাজের সমান্তরালভাবে কোনো ব্যক্তির জীবনকে বিচার-বিশ্লেষণ করা নিঃসন্দেহে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ। সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যাঁর জীবনী লেখা হচ্ছে, তাঁকে দেখার দৃষ্টিকোণ। সমাজের সঙ্গে তুলনা করে তাঁর জীবনের মূল্যায়ন করা। এর ফলে যাঁকে নিয়ে লেখা হচ্ছে, তাঁর জীবন ও প্রবণতা বোঝার বিষয়ে একটা নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এই মডেলটি পরে অনেকেই গ্রহণ করেন; তবে আজও এই মডেলের সবচেয়ে নামকরা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় রামতনু লাহিড়ী। কিন্তু এই জীবনীতে উনিশ শতকের সামাজিক ইতিহাস যতটা চোখে পড়ে, রামতনু লাহিড়ীকে ততটা দেখা যায় না। সেদিক দিয়ে বিচার করলে জীবনী হিসেবে এ বই অসম্পূর্ণ, এমনকি ব্যর্থ। কিন্তু এ গ্রন্থ জনপ্রিয় হওয়ার পর এর অনুকরণে অনেকেই সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনী রচনা করতে আরম্ভ করেন। এর মধ্যে রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য (১৯৭১) গ্রন্থে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় আরও একটা মাত্রা যুক্ত করেন সাহিত্যকে নিয়ে এসে।

December 2018

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

সর্বাধিক পঠিত
জেলা সংবাদ
সংশ্লিষ্ট সংবাদ