বুধবার ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ৫ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানি, ১৪৪০ Untitled Document

 আজ ফেনী মুক্ত দিবস

Untitled Document
হালনাগাদ :২০১৮-১২-০৬, ১১:২১

প্রতিনিধী

নুর উল্লাহ কায়সার/এমএহাসান/কবির আহাম্মদ নাছির: আজ ৬ ডিসেম্বর। ফেনী মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে মুক্তিকামী জনতা ফেনীতে স্বাধীনতার পতাকা তুলেছিলেন। কিন্তুু পাক হানাদারদের অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ ও নৃশংস গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বিজড়িত ফেনীর বধ্যভূমিগুলো স্বাধীনতার ৪৭ বছরপরও চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা হয়নি। এ নিয়ে ফেনীর মুক্তিযোদ্ধা  পরিবারের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। কয়েকটি বধ্যভূমি চিহ্নিত হলেও রয়েছে অযতেœ আর অবহেলায়। 
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ফেনী জেলার বিভিন্নস্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। নিহত মুক্তিকামী জনতার লাশ ফেলা হয় পুকুর, খাল, নদীনালা ও পাশ্ববর্তী জঙ্গলে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব স্থানকে বধ্যভূমি উল্লেখ করে তা সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ঘোষণা থাকলেও ফেনীতে তা বাস্তবায়ন হচ্ছেনা বলে দাবী করছেন মুক্তিযুদ্ধা ও তাদের স্বজনরা। 
ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা নেতা মীর আবদুল হানান জানান, ফেনীর উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিগুলো হচ্ছে, ফেনী সরকারি কলেজ এলাকার বধ্যভূমি, দাগনভূইয়া রাজাপুর বধ্যভূমি, ফুলগাজী জামুড়া গ্রামের বধ্যভূমি, পরশুরামের মালিপাথর বধ্যভূমি ও সলিয়া বধ্যভূমি। এছাড়াও ফেনীর বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে অন্তত ৫০টি বধ্য ভূমির তালিকা করে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে প্রেরণ করেছি। এর থেকে নাম মাত্র কয়েকটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হলেও সেগুলো রয়েছে অযতেœ অবহেলায়। কাঙ্খিত অগ্রগতি না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। 
তিনি জানান, ফেনী সরকারী কলেজ কম্পাউন্ডে রয়েছে একটি বড় বধ্যভূমি। বধ্যভূমির একাংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ফেনী কলেজের অনার্স ভবন। ভবনটির পেছনের অংশে বধ্যভূমির কিছু জায়গা জুড়ে রয়েছে ময়লার স্তুুপ ও সেপটিক ট্যাংক। ফেনী কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী জানে না ফেনী কলেজ ক্যা¤পাসের বধ্যভূমির ইতিহাস। ফেনী কলেজের দক্ষিণাংশে বধ্যভূমিটিকে কেন্দ্র করে একটি স্মৃতি স্তম্ভ তৈরী হলেও এটি রয়েছে অযতেœ অবহেলায়। ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের ভেতরের বধ্যভূমিটি সনাক্ত করে একটি স্মৃতিস্তম্ব নির্মাণ করা হলেও তা সংরক্ষণের জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। 
এদিকে দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুরের মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম পাটোয়ারী জানান, এখানকার রাজাপুর স্কুলের পাশে ছিলো পাক হানাদার বাহিনীর আস্তানা। আশপাশের এলাকা থেকে মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের ধরে এনে এখানে নির্যাতন করা হতো। এখানেই চৌধুরীবাড়ির পশ্চিম পাশের পুকুরে মুক্তিযোদ্ধা আশরাফকে গুলি করে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়। একই স্থানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারাত্মক আহত হয়ে বেঁচে যান ডাক্তার আবদুল হালিম। তিনি আজো পিঠের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। সেখানে বধ্যভূমি ঘোষণা করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানের দাবী জানান এলাকাবাসী। 

ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের জামুড়া এলাকার অধিবাসী মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, জামুড়া এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ২৭ জন মুক্তিকামী বাঙ্গালীকে বট গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এটি তিনি নিজেই দেখেছেন। শহীদদের মধ্যে শরিফা খাতুন, সেতারা বেগম, আবুল মনসুর, জোহরা আক্তার এ্যানী ও সাইফুল ইসলামের নাম তিনি জানেন। বাকীদের নাম তার জানা নেই। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জোর দাবী জানান প্রত্যক্ষদর্শী হাবিবুর রহমান। 
সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল বাশার বলেন, ফুলগাজীতে বেশ কয়েকটি বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে জামুড়া ও বিজয়পুরের রেল স্টেশনের পাশের বধ্যভূমি। এ ছাড়াও মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ফতেহপুরে ৫ জনের গণকবর থাকলেও আজও তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

পরশুরামের দুই বধ্যভূমি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি কেউ। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত মালিপাথর বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হলেও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখনও চিহ্নিত করা হয়নি সলিয়া বধ্যভূমি ।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ছিল বিলোনিয়া। মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক লে.কর্ণেল জাফর ইমাম বীর বিক্রমের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। বিলোনিয়ায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ইপিআর সদস্য রৌশন আজিজ, মোয়াজ্জেম হোসেন, আজিজুল হক ও গোলাম মোস্তফা। পরশুরাম থানা রোডে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি অবস্থিত।
বিলোনিয়ায় প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে এখনো লেখে আছে গুলির চিহ্ন। ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট একে একে পাক হানাদার মুক্ত করে বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী জয় করে। মুক্তিযোদ্ধারা এগুতে থাকলে পাকবাহিনীর একটি অংশ টিকতে না পেরে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। ৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় বিলোনিয়া ও ফেনী। এ সময় নির্বিচারে গণহত্যা চালায় পাক-হানাদার বাহিনী।
পরশুরামের দু’টি বধ্যভূমি সেই গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করছে। উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের মালিপাথর গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা করা হয় মুক্তিকামী একই পরিবারের ৫ সদস্যকে। এ বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করা হলেও রয়েছে অরক্ষিত। 
প্রাণে বেঁচে যাওয়া ওই শহিদ পরিবারের সন্তান মাওলানা নুরুল আমিন জানান, মালিপাথরের ওই স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তার বাবা, চাচা, জেঠাসহ ৫ জনকে। এখানেই শহীদদের গণকবর দেয়া হয়।
পৌরসভার সলিয়া বধ্যভূমিতে নিরবে শুয়ে আছেন একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞের শিকার একই পরিবারের ৩ মুক্তিকামী শহিদ। হত্যার পর তাঁদের লাশ ফেলে দেয় হয়েছিল সলিয়া দীঘিতে। সলিয়া দীঘির পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে বিলোনিয়া যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। এটিও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে।
পরশুরাম উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হুমায়ন শাহরিয়ার জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় সলিয়ায় ৩ জনকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকান্ডের স্থানটি আজও চিহ্নিত করা হয়নি।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রাসেলুল কাদের জানান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় স্বার্থে এসব বধ্যভূমি চিহ্নিত ও সংস্কার করা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক প্রকল্প আছে। এসব বধ্যভূমি সংরক্ষণে আমরা চিঠি প্রেরণ করব।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো: ওয়াহিদুজজামান জানান, আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতিগুলো জানাতে সবগুলো বধ্যভূমি চিহ্নিতকরে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ফেনী মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ জেলায় অনেকগুলো বধ্যভূমি রয়েছে। কিছু বধ্যভূমি চিহ্নিত করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে বাকী বধ্যভূমিগুলোকেও চিহ্নিতকরে সংরক্ষণ করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। 
 

December 2018

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

সর্বাধিক পঠিত
জেলা সংবাদ
সংশ্লিষ্ট সংবাদ