মঙ্গলবার ২২ অক্টোবর ২০১৯  ৭ কার্তিক ১৪২৬, ২১ সফর, ১৪৪১ Untitled Document

সদ্য সংবাদ

শারদীয় দুর্গাপুজা এক সংগ্রামী চেতনার প্রতীক -এডভোকেট প্রিয় রঞ্জন দত্ত

Untitled Document
হালনাগাদ :২০১৯-১০-০৬, ১১:০৪

অনলাইন ডেস্ক নিউজ

মাতৃ শক্তিপূজার এক অনুপম উপস্থাপনা ঘটেছে দুর্গাপূজা কাঠামোতে। ব্যক্তি পর্যায়ে শক্তিপূজার দু’টি সু-নির্দ্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়; একটি হলো উন্নত শক্তির নিকট আত্মসমর্পন এবং অপরটি হলো সহায়ক শক্তি লাভের আকাঙ্খা। ধর্মবিশ^াস একান্তই ব্যক্তিগত। এটা নিয়ে তর্ক কোন ভাবে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। কিন্তু ব্যক্তি বিশ^াস যদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশ^াসে রূপান্তরিত হয় বা তাকে প্রভাবিত করে তবে তা সামাজিক সম্পত্তি বা দায় হয়ে বসে। এরূপ পরিস্থিতিতে ধর্ম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়। দুর্গাপূজা বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিশাল অনুষ্ঠান। এটা পুরো সম্প্রদায় ও তার পারিপাশির্^কতাকে যেভাবে আন্দোলিত করে তা অন্য কোন অনুষ্ঠানে পারে না। ব্যক্তি বিশ^াসের বিভিন্ন মত এ অনুষ্ঠানে একাকার হয়ে যায়। দুর্গাপূজার আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপকতা ও ব্যয়বাহুল্য আজকাল ব্যক্তি বা পারিবারিক পর্যায়ে থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে সার্বজনীন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ফলত; তা আজ সামাজিক জীবনের এক অগ্রগণ্য বিষয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। এ কারণে এ অনুষ্ঠান সামাজিক মূল্যায়নের অবকাশ আজ  বেড়েছে। যে সামাজিক সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে এটার আয়োজন তার মূল্যায়নের সাথে সামাজিক কিছু উপাদান সম্পর্কিত। দুর্গাপূজার ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। এর সাথে সাথে আছে ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞান। পূজা কাঠামো পারসীক ও হেলেনীয় সভ্যতার সাথে ভারতীয় সভ্যতার সংমিশ্রন ঘটিয়েছে বলে ঐতিহাসিকদের সমর্থন রয়েছে। তাঁর দেবদেবীর ক্রমবিবর্তন ও কাঠামোগত উপস্থাপনা দিয়ে এরূপ সিদ্ধান্তে এসেছেন এবং যুক্তির পক্ষে ঐতিহাসিক নমুনা উপস্থাপনা করেছেন। সমাজতাত্তি¦ক বিশ্লেষণের সাথে কেউ কেউ অর্থনৈতিক মতবাদ জুড়ে দিয়ে তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও করেছেন। গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বুঝা যায় এক ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ এ উপস্থাপনা। কিন্তু একজন সাধারণ দর্শকের কাছে একটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের দৃশ্যই ফুটে উঠে সর্বতোভাবে। আজ সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ আপাত দৃষ্টিতে খুব জোরালো মনে না হলেও, কিন্তু তথাপি একটা গ্রহণযোগ্য তাৎপর্য আছে এ মুহুর্তে।
একথা আমরা সবাই মেনে নেবো যে ব্যক্তি জীবন, পরিবার, কোন প্রতিষ্ঠান বা সমাজের অস্তি¡তের জন্য সংগ্রামপূর্ণ পরিস্থিতি এক অপরিহার্য শর্ত। এটার মোকাবিলা সার্বক্ষণিকভাবে করতেই হয় সচেতন বা অচেতনভাবে। প্রাণীজগতে জীবন ধারণের স্বাভাবিক নিয়ম ছাড়াও আত্মরক্ষা এক বড় কাজ। বড় মাছ থেকে আত্মরক্ষার প্রাণান্ত চেষ্টা হলো ছোট মাছগুলোর, পায়রার চেষ্টা হলো বাজপাখী থেকে জীবন রক্ষা করা। মানুষও আজ প্রাণী জগতের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে। কারণ আক্ষরিক অর্থে প্রাণ সংহার আর অর্থনৈতিকভাবে হত্যার প্রচলন মনুষ্য সমাজে সার্বক্ষণিক চলমান নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষ হীনকর্মে পশুদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাই এক শ্রেণীর মানুষকে আত্মরক্ষার জন্য অপর শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম লিপ্ত থাকতে হচ্ছে। প্রাণীজগত আর মনুষ্য জগত এক না হলেও, তাদের আইনকানুন ভিন্ন ভিন্ন হলেও মানুষের বৃহৎ অংশের আচরণ নি¤œস্তরের প্রাণীদের মতই। তাই ক্ষমতাবানদের টিকে থাকার পরিবেশ নির্মানে বিশ^ব্যাপী বিপুল আয়োজন। অপরদিকে ক্ষমতাহীনদের চেষ্টাও টিকে থাকার। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীক ও আন্ত:রাষ্ট্রীক সর্বপর্যায়ে বিভিন্ন রূপে সংগ্রাম চলছে অব্যাহত গতিতে। দুই বৈপরীত্যের দ্বন্দ্ব কোন বাছাই করা বিষয়ে নয় বরং মনুষ্য প্রকৃতি, সমাজ প্রকৃতি, শ্রেণী প্রকৃতি ও ব্যবস্থাপনা প্রকৃতিতেও বিদ্যমান। তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকুক বা না থাকুক, এ পরিস্থিতিতে দ্বন্দ্ব সমন্বয় সূত্রের প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। এ সংগ্রামের এক সার্থক উপস্থাপনা হলো শারদীয় পূজা কাঠামোতে। শুভ এবং অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব প্রকৃতিতেই অবস্থান করছে। তাই দেখছি কাঠামোতে। সুরশক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দূর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস¦তী আর বিপরীতে মহিষাসুর। ব্যক্তি মনে সুর এবং অসুর শক্তির বা ইতিবাচক ও নেতিবাচক চিন্তার প্রতিফলন যেন এ কাঠামোত। দুর্গার মধ্যে সংস্থাপিত হয়েছে দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি। তাই এ শক্তি অপরাজেয় এবং অসুর সংহারিনী। সরস্বতী প্রজ্ঞার আধার। কার্তিক ক্ষাত্রশক্তির প্রতীক। লক্ষ্মী ধনশক্তির আর গণেশ গণশক্তির। এটা ধর্মীয় ব্যাখ্যা। ব্যক্তি বিশ^াস বা সামাজিক বিশ^াসে এ সব গুণসমাহারের জন্য দেবতার নামগুলো পরিবর্তন করে দিলেও কি অর্থের কোন পরিবর্তন হতো? না হতো না। দেবভাবের সাথে প্রজ্ঞা, ক্ষাত্রশক্তি, ধনরাজি ও গণশক্তি থাকলে অসুরশক্তিকে পরাভূত করা যাবে। এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তি এবং সমাজ উভয় পর্যায়ে কার্যকর হয়েছে।
আজ সমাজে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অশুভ শক্তির দাপট। এটা বদ্ধপরিকর মানুষের সমস্ত শুভ চিন্তা কর্মকে গ্রাস করেছে। উপাদানগত কিছু পার্থক্য থাকলেও পৃথিবীর সব সমাজে এ কালো শক্তি বর্তমান। রোগের যেমন লক্ষণ থাকে তেমনি অসুরশক্তির আবির্ভাবেরও কিছু লক্ষণ আছে। আমাদের সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি, লু›ঠন, হাইজ্যাক, হত্যা, সন্ত্রাস, ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদিতা, মিথ্যাচার, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ইত্যাদি হলো অপশক্তি। এরাই প্রমাণ করে দেশে অসুরশক্তির উপস্থিতি। মানবতাবিরোধী এসব অপরাধ যারা করে তারাই অসুর এবং প্রতীকী অর্থে মহিষাসুর। তাই আজ প্রয়োজন এসব কালো শক্তিকে চিহ্নিত করা। এরা কোথায় থাকে? আমাদের চারপাশে যে চিন্তা, কল্পনা, মন ও শক্তি এ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তারা হলো শুভশক্তি বা সুরশক্তি বা দেবশক্তি। এসব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোন কোন সম্প্রদায়ে এসব শক্তি আছে? সুর এবং অসুর শক্তি সব সম্প্রদায়ে আছে। সুতরাং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের শুভ শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে অশুভশক্তির বিরুদ্ধে। সুতরাং দুর্গাপুজার সমগ্র মানব সমাজের প্রতি এক প্রবল তাৎপর্যপূর্ন অনুষ্ঠান। এটা পাপ-পূন্য এবং স্বর্গ-নরক বিচার ব্যক্তিপর্যায়ে রেখেও যদি দুর্গাপূজাকে সামাজিক দৃষ্টিতে দেখা যায় তাহলে এটা সামাজিক শক্তি বিন্যাসে ব্যাপক দ্যোতনা সৃষ্টিকারী এক একটা অনুষ্ঠান।
দেবশক্তির পুত্রকন্যা রূপে চারটি শক্তিকে আমাদের পারিবারিক ঠিকানায় এনে দিয়েছে পূজাতত্ত্ব, সরস্বতী, কার্তিক, লক্ষী ও গণেশ-এ চার সন্তানকে চারটি প্রতীক রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ চর্তুগুনের সমাহারে সামাজিক শক্তির সমন্বয় সাধন করতে বলা হয়েছে। আবার এ চারটি শক্তি সনাতনী সমাজ ব্যাখ্যার চারটি বর্ণও বটে। সনাতনী সমাজ চার বর্ণে বিভক্ত-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র্র। মনুষ্য সমাজের এরূপ গুণবাচক বা কর্মবাচক বিভাজন এক অপরিহার্য ব্যবস্থা। সমাজটা পুরানো হোক বা আধুনিক হোক, প্রচ্যের হোক, বা পাশ্চাত্যের হোক, সনাতনী হোক বা অপরাপর সম্প্রদায়ের হোক, একক সম্প্রদায়রাষ্ট্র হোক বা বহু সম্প্রদায়রাষ্ট্র হোক, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ বা প্রগতিবাদী সমাজ হোক, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক সমাজ হোক আস্তিকের বা নাস্তিকের সমাজ হোক তার মানুষগুলোর কর্ম বিভাজন প্রয়োজন। একই মানুষের বিবিধগুণ থাকতে পারে। তারপরও এ কর্মবিভাজন হেতু মানুষের পেশাগত পরিচয থাকতে হবে। সমাজে কেউ জ্ঞানের অধিকারী, কেউ রণনৈপুন্যের, কেউ ব্যবসা-বিত্ত- শিল্পের এবং কেউ শ্রমের। শ্রমজীবী মানুষই প্রতিটি সমাজে বেশী হবে, তাই এটা গণশক্তি।
আসুরের ঠিকানা কোথায়? মানুষের মনে, চিন্তায়, চেতনায়, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক স্তরে, রাষ্ট্রে এবং বিশ^ পরিসরে। এ চিন্তা যদি সংগঠিত রূপ পায় তাহলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী নির্মাণ করে এবং গড়পড়তাভাবে সমাজ আসুরিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলে সমাজে সর্ববিধ অবক্ষয় পরিলক্ষিত হয়। সেই মুহুর্তে শুভশক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়। আজ দেশে অসুর শক্তি প্রবল। দেবতা আর অসুরের বসবাস পাশাপাশি একই বাংলায় আলো বাতাসে। আজ প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী চেতনায় যুদ্ধ ঘোষনার। এ সংগ্রামী যুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুরশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সমাজকে রক্ষা করতে হবে। যুদ্ধের একটা ফল আছে। এটা জয় এবং ফল স্বরূপ সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন। এ যুদ্ধ বিরতিহীন এবং পরিবর্তনও বিরতিহীন। সংগ্রাম- পরিবর্তন- সংগ্রাম এ যেন নিরন্তন বিপ্লব সাধন। পরিশেষে দীর্ঘকালীন এ ক্রম পরিবর্তনের ফলে দেখা যাবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তন হলো ক্রমবিবর্তনবাদী ধারায়। দূর্গাপূজার শিক্ষা হলো সৃজনশীল ক্রমবিবর্তনবাদী এবং ঝটিকা পরিবর্তন সাধন উভয়ই। আমাদের পূজা সংস্কৃতিক গভীর ভাবে অনুধ্যান ও হৃদয়ঙ্গম করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে সুস্থ জনগণের, বিশেষ ভাবে সনাতনী জনগোষ্ঠির। এ সিদ্ধান্ত শুধু পূজানুষ্ঠানের নয় বরং কার্যকর অনুশীলনের। শারদীয়া দুর্গোৎসব আমাদের সবাইকে এক সংগ্রামী চেতনার প্রতীক হিসেবে উদ্দীপ্ত করুক আজ।
 
- লেখক
সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি সহ সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।

 

October 2019

SunMonTueWedThuFriSat
1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

সর্বাধিক পঠিত
জেলা সংবাদ
সংশ্লিষ্ট সংবাদ